একসময় বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে চিন্তায় থাকতো মানুষ। কিন্তু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম নেই। বছরের যে কোনো সময়ই হতে পারে ডেঙ্গু জ্বর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগরায়ণসহ নানান কারণে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যাও। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে যেমন ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে হবে, আবার ভ্যাকসিন বা টিকার ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণার পর ডেঙ্গুর কিছু নতুন টিকা (Dengue Vaccine) বাজারে এনেছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে বিশ্ববাজারে আসা এই টিকাগুলো আসলে কতটুকু সুরক্ষা দিচ্ছে এবং এর দামই বা কত- এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
আরও পড়ুন
মশা দিয়েই মশা নিধন / বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব কৌশল
বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ। গত ২৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আবিষ্কৃত ডেঙ্গু টিকা
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রধানত দুটি ডেঙ্গু টিকা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমটি ফরাসি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সানোফি পাস্টুরের তৈরি ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ (Dengvaxia)। এটি ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশ্বের প্রথম নিবন্ধিত টিকা হিসেবে পরিচিতি পায়। দ্বিতীয় এবং বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত টিকাটি হলো জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga)। এটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (এনআইএআইডি) উদ্ভাবিত ‘টিভি-০০৫’ (TV-005) নামে একটি একক ডোজের টিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। এর সফল ট্রায়াল বাংলাদেশেও সম্পন্ন হয়েছে।

টিকা/ প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
ডেঙ্গু টিকা কীভাবে কাজ করে
ডেঙ্গু ভাইরাসের মূলত চারটি ভিন্ন রূপ বা সেরোটাইপ রয়েছে, যা ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪ নামে পরিচিত। নতুন টিকাগুলো মূলত ‘টেট্রাভ্যালেন্ট লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড’ প্রযুক্তিতে তৈরি। এর অর্থ হলো, টিকার ভেতরে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপেরই দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় ভাইরাস উপাদান থাকে।
আরও পড়ুন
২ বার হলে নিশ্চিত মৃত্যু? ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর সত্যতা কতটুকু
এটি মানবদেহে প্রবেশ করার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে সজাগ করে তোলে। ফলে শরীর আগে থেকেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি করে। পরে আসল ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রমণ করলে শরীর সহজে তা প্রতিরোধ করতে পারে।
ডেঙ্গু টিকা কতটা কার্যকর
জাপানের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ (টিএকে-০০৩) টিকাটি ডেঙ্গুর চার ধরনের সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম। দীর্ঘ সাত বছরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী, এই টিকা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৬১ দশমিক ২ শতাংশ কমাতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি ডেঙ্গুজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি প্রায় ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। এমনকি বুস্টার ডোজ নেওয়ার পর এই কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকার সফলতার হার গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি। তবে এটি কার শরীরে দেওয়া হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে কার্যকারিতার হার। এটি কেবল তাদের দেওয়া যায়, যারা অতীতে অন্তত একবার ল্যাবরেটরিতে প্রমাণিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।
তবে বাংলাদেশে পরীক্ষিত এক ডোজের ‘টিভি-০০৫’ টিকা ডেঙ্গুর চারটি রূপের বিরুদ্ধেই সমানভাবে কার্যকর এবং শরীরের শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু ভাইরাসের নামকরণ হয়েছিল যে বিচিত্র উপায়ে
কোন কোন দেশ অনুমোদন দিয়েছে
২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকার শিশু ও কিশোরদের জন্য ‘কিউডেঙ্গা’ টিকার প্রাক-অনুমোদন বা সুপারিশ দিয়েছে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ২৪টিরও বেশি দেশে এই টিকা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। বিশেষ করে ব্রাজিলে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকা ২০১৫ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু দেশসহ প্রায় ২০টি দেশে অনুমোদিত। তবে এর ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ।

টিকা/ প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
ডেঙ্গু টিকার দাম কেমন
আন্তর্জাতিক বাজারে ডেঙ্গুর নতুন টিকার দাম সাধারণ মানুষের জন্য বেশ চড়া। জাপানের ‘কিউডেঙ্গা’ টিকার পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার জন্য তিন মাসের ব্যবধানে মোট দুটি ডোজ নিতে হয়। ডেংভ্যাক্সিয়া টিকার লাগে মোট তিনটি ডোজ।
থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে এই টিকাগুলোর প্রতি ডোজের দাম দেশভেদে প্রায় ৬০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই বা তিন ডোজের সম্পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করতে একজন ব্যক্তির প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা বা তার বেশি খরচ হতে পারে।
ডেঙ্গু টিকার সীমাবদ্ধতা
বর্তমানে বাজারে থাকা এবং পরীক্ষাধীন ডেঙ্গু টিকাগুলো আশার আলো দেখালেও এগুলোর কিছু বড় সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
- আগের সংক্রমণের শর্ত: ফরাসি কোম্পানি সানোফি পাস্টুরের তৈরি প্রথম ডেঙ্গু টিকা ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ কেবল তাদেরই দেওয়া যায়, যারা অতীতে অন্তত একবার নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আগে কখনো ডেঙ্গু আক্রান্ত হননি, তারা এই টিকা নিলে পরবর্তীতে প্রথমবার আসল ডেঙ্গু ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে রোগটি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে (যাকে অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট বা ADE বলা হয়)।
- সেরোটাইপভেদে কার্যকারিতার তারতম্য: জাপানের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা ডেঙ্গুর চারটি রূপের (সেরোটাইপ) বিরুদ্ধে কাজ করলেও সবগুলোর ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সমান নয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি ডেঙ্গু সেরোটাইপ-২ এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো (প্রায় ৮৮-৯০ শতাংশ) কাজ করে, তবে সেরোটাইপ-৩ এবং সেরোটাইপ-৪ এর বিরুদ্ধে এর সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম।
- বয়সের সীমাবদ্ধতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের ওষুধ প্রশাসন কিউডেঙ্গা টিকাকে মূলত নির্দিষ্ট বয়সের (যেমন ৪ থেকে ৬০ বছর বা ৬ থেকে ১৬ বছর) জন্য অনুমোদন দিয়েছে। ফলে চার বছরের কম বয়সী শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তিরা, যারা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তারা এই টিকার সুরক্ষার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
- একাধিক ডোজ ও দীর্ঘ সময়: কিউডেঙ্গা টিকার পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার জন্য তিন মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে হয়। এর মানে হলো, টিকা নেওয়ার পর সম্পূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত তিন মাস সময় লেগে যায়, যা কোনো চলমান ডেঙ্গু মহামারির সময়ে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে পারে না।
- উচ্চ মূল্য ও সহজলভ্যতার অভাব: আন্তর্জাতিক বাজারে এই টিকাগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে হাজার হাজার টাকা খরচ করে দুই ডোজের টিকা নেওয়া অসম্ভব। পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সীমিত হওয়ায় অনেক দেশ টাকা দিয়েও এই টিকা সহজে সংগ্রহ করতে পারছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত দেশে কোনো ডেঙ্গু টিকা গণহারে ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই টিকাগুলো এখনও বিশ্বব্যাপী সর্বজনীনভাবে সব বয়সীর জন্য গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে হুট করে কোনো টিকার অনুমোদন দিলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু ছড়ানো এডিস মশা চিনবেন কীভাবে?
তবে আশার কথা হলো, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b) এবং যুক্তরাষ্ট্রের লার্নার কলেজ অব মেডিসিন যৌথভাবে বাংলাদেশে ‘টিভি-০০৫’ টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করেছে। এই টিকা মাত্র এক ডোজের হওয়ায় এবং চার ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধেই কার্যকর হওয়ায় এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও উপযোগী হতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (EDCL) মাধ্যমে টিকা উৎপাদনের প্রাথমিক পরিকল্পনাও আলোচনাধীন।
এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আ. সামাদ মৃধা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় ডেঙ্গু বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এক বছরের মধ্যে এই টিকা উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, আগামী বছরের জুনের মধ্যে উৎপাদন শুরু করে সরকারের কাছে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট, ডব্লিউএইচও, এনআইএইচ, দ্য স্ট্রেইট টাইমস, বিবিসি বাংলা ১ ও ২
কেএএ/ এমএফএ








