এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই অবস্থায় জোরেশোরে বাড়ছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ। বছরের প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালে যাওয়া ডেঙ্গু রোগীর ৪৮ শতাংশই ভর্তি হয়েছে জুন মাসে। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে ডেঙ্গু ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে আগামী চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাসসৃষ্ট এই জ্বরের প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন রোগতত্ত্ব এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের হিসাবে বছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় জুন মাসে এসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ দেখা গেছে। শুধু জুন মাসেই সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন; যা বছরের মোট সংক্রমণের ৪৮ শতাংশ। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে) দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ জন; আর জুন মাসেই ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬২৯ জন রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে। চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ১৪০ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮৭১ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ বছর বিশেষ করে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয়সহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান দিচ্ছে।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। ফলে জুলাই মাসজুড়ে এডিস মশার ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
জুলাই মাসে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তাঁর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঢাকার তুলনায় বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলা ছাড়াও গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট ও নরসিংদীতে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে পারে।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে না দেখে সাধারণ মশা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফগিং ও ড্রেন-নর্দমায় লার্ভানাশক প্রয়োগ মূলত কিউলেক্স মশার বিরুদ্ধে কার্যকর। কিন্তু এডিস মশা বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, বেসমেন্ট এবং জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। এডিসের প্রজননস্থল লক্ষ্য করে প্রমাণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি না নিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শুধু ফগিং দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়মিত মশার সার্ভেইল্যান্স (নজরদারি), রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ, লার্ভার উৎস ধ্বংস এবং তথ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতালভিত্তিক তথ্য দিয়ে কোনো এলাকার প্রকৃত ডেঙ্গু পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।’
ইমরুল কায়েস আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কম থাকলেও আবহাওয়া ও ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল সামনে এনেছেন সমন্বয়ের বিষয়টি। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ সমন্বয়ের অভাব। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় কোথায় কখন মশা নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে, কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে বা কোথায় হটস্পট তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্যের সমন্বিত ব্যবহার হচ্ছে না।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘সরকার থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নেই। মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয় না। ডেঙ্গুর রোগতাত্ত্বিক নজরদারি, গবেষণা, তত্ত্বাবধায়ন, পর্যালোচনা ও পরিস্থিতি মূল্যায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয় রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদার, চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান এবং প্রশিক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি নেই।’







