ফিটনেস মানুষের সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনের অন্যতম ভিত্তি। নিয়মিত শরীরচর্চা শরীরকে শক্তিশালী রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। ফিট থাকলে দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজে করা যায় এবং ক্লান্তি কম অনুভূত হয়। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সুস্থতার জন্যও ফিটনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সুস্থ থাকতে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প নেই। তাই দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করতে ফিটনেসকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি। সাধারণ মানুষের জন্য বটে, বিনোদন জগতের তারকাদের জন্য ফিটনেট আরও বেশি জরুরি। নাচ, গান, অভিনয়ের পাশাপাশি তাদের শারীরিক সৌন্দর্যও দর্শক আকর্ষণের অন্যতম নিয়ামক। সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে ভক্ত দর্শকরা অনুসরণ করেন। সুস্থ থাকা তো বটে, ক্যারিয়ার ধরে রাখার স্বার্থেও নিজের ফিটনেস ধরে রাখা একজন তারকার জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

বিশ্বব্যাপী প্রায় সব তারকাশিল্পীই নিজেদের ফিটনেস নিয়ে বেশ সচেতন। দ্য রক’খ্যাত হলিউড তারকা ডোয়াইন জনসন ফিটনেসের ক্ষেত্রে এক অনন্য উদাহরণ। তিনি প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রায় দুই ঘণ্টা জিমে সময় দেন। ভারোত্তোলন, কার্ডিও ও উচ্চমাত্রার শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম তার রুটিনের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই নিজের কঠোর অনুশীলনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন তিনি। অন্যদিকে ‘থর’ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া হলিউডের আরেক অভিনেতা ক্রিস হেমসওর্থও প্রতিনিয়ত শক্তি বৃদ্ধি ও কার্যকর ফিটনেসের ওপর জোর দেন। তার ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে ওজন উত্তোলন, বক্সিং, সাঁতার ও সার্ফিং। তিনি বিশ্বাস করেন, শরীরচর্চা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, মানসিক শক্তিও বাড়ায়। টম ক্রুজকে দেখে কী কেউ বলবে, তার বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর আগে! ফিটনেস তিনি এতটাই সচেতন যে, বয়সকে বেঁধে রাখা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব।

বলিউডে ফিটনেসের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হৃত্বিক রোশান। কঠোর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত জিম অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজের শারীরিক গঠন ধরে রেখেছেন। সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন ওজনভিত্তিক ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম তার রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শাহরুখ, সালমান, আমির খানসহ অন্যরাও নিজেদের ফিটনেস ধরে রাখার জন্য সবসময় সচেষ্ট। অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন নিয়মিত যোগব্যায়াম, পাইলেটস এবং কার্ডিও অনুশীলন করেন। তিনি মনে করেন, মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক সুস্থতা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একইভাবে শিল্পা শেঠী বহু বছর ধরে যোগব্যায়ামের মাধ্যমে নিজেকে ফিট রেখেছেন। তার যোগচর্চার ভিডিও লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

সংগীত জগতেও ফিটনেসের গুরুত্ব কম নয়। পপ গায়িকা টেইলর সুইফট কনসার্টের প্রস্তুতির সময় নিয়মিত ট্রেডমিলে দৌড়ান এবং সহনশীলতা বৃদ্ধির ব্যায়াম করেন। কারণ একটি লাইভ কনসার্টে টানা কয়েক ঘণ্টা গান গাওয়া ও মঞ্চে নড়াচড়া করা সহজ কাজ নয়। কোরিয়ান পপ তারকাদের ক্ষেত্রেও ফিটনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিসা এবং জেনি নিয়মিত নৃত্য অনুশীলন, স্ট্রেচিং ও পাইলেটসের মাধ্যমে নিজেদের ফিট রাখেন। প্রতিদিনের দীর্ঘ রিহার্সালই তাদের জন্য এক ধরনের পূর্ণাঙ্গ শরীরচর্চা।

উপরোক্ত নামগুলো কেবল উদাহরণ। বিশ্বের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সব তারকাশিল্পীই ফিটনেসের প্রতি যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম। ফিটনেস ধরে রাখা তো দূরের কথা, হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ তারকাশিল্পী নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন নয়। দেশের শোবিজ অঙ্গনে ফিটনেস সচেতনতার চিত্র আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও অনেক তারকাশিল্পী এখনো নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। অনেকেই চরিত্রের প্রয়োজন বা বিশেষ অনুষ্ঠানের আগে হঠাৎ ওজন কমানো বা বাড়ানোর চেষ্টা করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকাদের মতো নিয়মিত জিম, যোগব্যায়াম কিংবা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুসরণের প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বয়সের সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা ও পর্দার উপস্থিতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। নায়িকাদের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি প্রকট। স্থুলতার জন্য অনেকেই নাটক সিনেমা থেকে অকালেই হারিয়ে গেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তারকাদের জন্য ফিটনেস শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং পেশাগত প্রয়োজন। সুস্থ শরীর দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা বাড়ায়, ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং চরিত্রের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। অনেক অভিনেতাকে নির্দিষ্ট চরিত্রের জন্য ওজন বাড়াতে বা কমাতে হয়। সেক্ষেত্রে ফিটনেস প্রশিক্ষক ও পুষ্টিবিদের সহায়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

ফিটনেস ধরে রাখার বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো নানা রোগের ঝুঁকি কমায়। দ্বিতীয়ত, মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, কর্মক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শরীরচর্চা মনোযোগ বৃদ্ধি এবং ঘুমের মান উন্নত করতেও সহায়ক।

তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তারকাদের অনেক সময় অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড বজায় রাখার চাপের মুখে পড়তে হয়। অতিরিক্ত ডায়েটিং, কঠোর ব্যায়াম কিংবা দ্রুত ওজন কমানোর প্রচেষ্টা কখনও কখনও শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে। অনেক তারকা স্বীকার করেছেন যে, নিখুঁত শরীর ধরে রাখার চাপ তাদের উদ্বেগ ও মানসিক ক্লান্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

অন্যদিকে ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তারকাদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ভালো, কিন্তু অন্ধভাবে তাদের রুটিন অনুসরণ করা উচিত নয়। একজন পেশাদার অভিনেতা বা সংগীতশিল্পীর জন্য তৈরি খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় উপযোগী নাও হতে পারে। কারণ, তারকাদের ক্ষেত্রে এটি পেশারই একটি অংশ। ক্যামেরার সামনে উজ্জ্বল উপস্থিতির জন্য যে কঠোর অনুশীলন, ঘাম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, তা দর্শকের চোখে সবসময় ধরা পড়ে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারকাখ্যাতির আলোয় উজ্জ্বল থাকার পেছনে ফিটনেসই অন্যতম বড় শক্তি।