দেশের ফল রপ্তানির অন্যতম বড় বাধা পর্যাপ্ত কার্গো স্পেসের সংকট বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।

তিনি বলেন, মৌসুমে রপ্তানিকারকরা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে রাজি থাকলেও প্রয়োজনীয় কার্গো স্পেস পান না। ফলে অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হয় না।

শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রকল্প পরিচালক বলেন, পিক সিজনে রপ্তানিকারকদের জন্য নির্দিষ্ট কার্গো বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ফলের একটি অংশ নষ্ট হয় জানিয়ে মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, কিছু ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহৃত হলেও সেই সক্ষমতাও সীমিত। প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হলে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের ফল রপ্তানির বড় বাধা কার্গো স্পেস সংকটগোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা

রপ্তানির ক্ষেত্রে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সব দেশের জন্য এটি বাধ্যতামূলক না হলেও যেসব দেশে প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে রপ্তানির জন্য এ প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। তবে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিদ্যমান ভিএইচটি প্ল্যান্টের কার্যকারিতা মূল্যায়নের পর ধাপে ধাপে এ সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

আরও পড়ুন

হিমসাগর-ল্যাংড়াকে হটিয়ে ‘সেরা’ আম এখন আম্রপালি

আরিফুর রহমান বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত ফল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, উন্নতমানের ফল উৎপাদনের পর তারা সেই মানের ক্রেতা পাবেন কি না। বাজারের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক কৃষক ভালো মানের উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

বর্তমানে একই আমবাগানের ফলও মান ও জাতভেদে ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে জানিয়ে এই প্রকল্প পরিচালক বলেন, কোথাও প্রতি কেজি আম ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবার একই বাগানের অন্য জাতের আম ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাই শুধু ফল উৎপাদন নয়, কোন জাতের ফল কোন শিল্পে ব্যবহার হবে এবং কোন বাজারের জন্য উপযুক্ত হবে— তা বিবেচনা করেই ভ্যারাইটি নির্বাচন করতে হবে।

আম্রপালির মতো সব জাত প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য উপযোগী নয় জানিয়ে বলেন, লক্ষ্মণভোগ, আশ্বিনা ও কিছু নির্দিষ্ট জাত শিল্পে বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী ফলের জাত নির্বাচন করলে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়েই লাভবান হবেন।

roundtableকৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পের প্রসারে নীতিগত কিছু প্রতিবন্ধকতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। একটি ছোট কারখানা চালু করতে ১৫ থেকে ১৬টি লাইসেন্স নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার মোট বিনিয়োগের ২০ থেকে ৩০ শতাংশই লাইসেন্স পেতেই ব্যয় হয়ে যায়। এজন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানান তিনি।

দেশে ছোট এসএমই উদ্যোক্তাদের বড় শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দেবে, আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করবে— এমন সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প দ্রুত এগিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

বিনার গবেষকদের নতুন সাফল্য ‘বিনা সফেদা-১’

মোহাম্মদ আরিফুর রহমান আরও বলেন, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ফলের মাত্র ২ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ হার ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।

ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ