ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন চিত্রটা ছিল মলিন। কেননা প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিবন্ধক ছিল রাষ্ট্র নিজে। রাষ্ট্রের ভাঙা-গড়াতে এবং সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের আগমনে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বারবার বিঘ্নিত হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে গেছে জ্ঞানের চর্চা এবং রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্ব-আরোপিত, দায়িত্ব পালনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) অডিটোরিয়ামে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ।
মূল প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাস এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। লড়াইটা চলছে দুই ফ্রন্টে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাপনার। বিশ্ববিদ্যালয় এই দুই কর্তব্যের কোনোটাতেই পিছিয়ে থাকেনি এবং সেখানেই এর গৌরব ও বৈশিষ্ট্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গবেষণা প্রসঙ্গে মূল প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ আছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নেমে গেছে। কথাটা একাংশে হয়তো সত্য; তবে অপরাংশে সত্য হলো অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই শিক্ষার মানের ব্যাপারেও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী কিন্তু আগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি জানে ও বোঝে; তবে তাদের সংখ্যা অধিক নয়। মানের নিম্নগমনের মূল দায়িত্বটা অবশ্য রাষ্ট্রেরই। অভিযোগ এটাও যে গবেষণার ক্ষেত্রে অভাব দেখা দিয়েছে। এই অভিযোগ কিন্তু সত্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গবেষণা হয়; কিন্তু সব গবেষণা প্রকাশ পায় না, প্রচারও তেমন ঘটে না, এবং গবেষণার ফল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রযুক্ত হয় না। গবেষণার পরিমাণ ও উপযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের যতটা নয়, তার চেয়ে অধিক রাষ্ট্রব্যবস্থার।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর টাইমস হায়ার এডুকেশন ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিংসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬০০ ধাপ এগিয়েছে। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি এবং এশিয়া র্যাঙ্কিংয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ারের যৌথভাবে প্রণীত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন গবেষকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উপাচার্য ‘ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান ২০২৬-২০৪৬’শীর্ষক ২০ বছরমেয়াদি একটি রূপরেখা উন্মোচন করেন, যার লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাকেন্দ্রিক ও ভবিষ্যৎমুখী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীরা যে ভূমিকা রেখেছে, আমার বিশ্বাস আগামী দিনেও গণতন্ত্র এবং উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেভাবে এগিয়ে যাবে।’
সভায় আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসুর) সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম।








