‘পান্তা খেয়ে ঢাকায় যাই/ রাতে বাড়ি ফিরতে চাই!’-এ শ্লোগানে সকাল-সন্ধ্যা ঢাকা-যশোর ট্রেনের দাবিতে ফের আন্দোলনে নামছে যশোরবাসী।

সোমবার (৬ জুলাই) অবিলম্বে প্রভাতী ট্রেনসহ ছয়দফা দাবিতে যশোর রেলওয়ে জংশনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ এ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে জানান, রেলের জন্য তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছেন, দাবি আদায় না হলে তারা আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন।

সংবাদ সম্মেলনে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, ‘ঢাকা-যশোর পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পে’র শুরু থেকেই যশোরবাসী বঞ্চিত এবং প্রতারিত হয়ে আসছে। প্রকল্পের নাম ‘ঢাকা-যশোর’ হলেও বিগত সরকারের আমলে বৈষম্যমূলক চক্রান্তের মাধ্যমে যশোর শহরকে রেল সুবিধার বাইরে রাখার নীলনকশা করা হয়েছিল। যশোরবাসীকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ‘পদ্মবিলা’ নামক প্রত্যন্ত স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরার আত্মঘাতী পরিকল্পনা করা হয়। সংবাদপত্রে এ ষড়যন্ত্রের কথা সামনে এলে যশোরবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সংগঠিত প্রতিবাদ শুরু করে।

এরপর প্রকল্পের উদ্বোধনী দিনে একটি ট্রেন পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু তা আমাদের কাঙ্খিত সময়ে নয়। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু প্রকল্পের রেলপথে দিনে মাত্র একটি ট্রেন দুইবার যাতায়াত করে-যা রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয়ের শামিল।

তাই প্রথম থেকেই যশোরবাসী দাবি করে আসছে, ভোরবেলা যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে একটি ‘প্রভাতি ট্রেন’ দেওয়া হোক, যাতে সাধারণ মানুষ নিজ বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ঢাকায় গিয়ে অফিস বা প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে পারেন। একইসঙ্গে সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে যশোরের উদ্দেশ্যে একটি ফিরতি ট্রেন দেওয়া হোক, যাতে কাজ শেষে মানুষ নিজ ঘরে ফিরে ঘুমাতে পারেন।

তিনি আরও জানান, বেনাপোল, যশোর, মোবারকগঞ্জ এবং কোটচাঁদপুর থেকে প্রতিদিন ঢাকার উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী যাতায়াত করেন। এখানে রেলের ট্রিপ বাড়ালে বাংলাদেশ রেলওয়ে তথা সরকার আর্থিকভাবে বিপুল লাভবান হবে। কারণ রেল যোগাযোগ শুধু নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধবই নয়, এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও সড়কপথের চেয়ে অনেক কম।

প্রকৌশলী রুহুল আমিন সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলো- অবিলম্বে বেনাপোল/দর্শনা সীমান্ত-যশোর-ঢাকা রুটে ১টি প্রভাতি আন্তঃনগর ট্রেনসহ মোট ৩টি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করতে হবে। সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে সকল আন্তঃনগর ট্রেনে পর্যাপ্ত সাধারণ বগি যুক্ত করতে হবে। দর্শনা-খুলনা রুট এবং বেনাপোল-যশোর রুটে দ্রুত ডবল রেল লাইন স্থাপন করতে হবে। বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত থেকে যশোর-ঢাকা রুটে নিয়মিত কমিউটর ট্রেন চালু করতে হবে। সিঙ্গিয়া রেল স্টেশনে অবিলম্বে রেল কনটেইনার টার্মিনাল’ চালু করে বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে হবে। রেলকে দেশের গণযোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

প্রকৌশলী রুহুল আমিন আরও বলেন, আমরা ২০২৩ সাল থেকে এই ন্যায্য দাবিতে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে আসছি। এসময়ে আমরা রেলমন্ত্রী, রেল সচিব, রেলের ডিজি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছি। রেল সচিব ও ডিজির সাথে যৌথ মতবিনিময় ছাড়াও একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ, দুইবার রেল অবরোধ ও কালো পতাকা প্রদর্শন এবং রেলের ডিজিকে অবরুদ্ধ করার মতো কর্মসূচি পালন করেছি।

সেই আন্দোলনের মুখে রেলের সচিব ও ডিজি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, মার্চ বা এপ্রিলের মধ্যে আরও একটি আন্তঃনগর ট্রেন দেওয়া হবে। এখন জুলাই ২০২৬ চলমান, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন দেখিনি। গত জুন ২০২৬-এর মধ্যে প্রভাতি ট্রেন দেওয়ার আলটিমেটাম থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। ফলে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৬ জুলাইয়ে আমরা যশোর রেল স্টেশন প্ল্যাটফর্মে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছি। সোমবার বেলা ১টায় যশোর রেলওয়ে জংশনে এই কর্মসূচি পালিত হবে। যদি আমাদের দাবি মানা না হয়, তবে যশোরবাসী আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক জাতীয় হকি কোচ কাওসার আলী, যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান ভিটু, যুগ্ম সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান মিলন সহ আরও অনেকে।

মিলন রহমান/কেজে/এএসএম