গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিযানে ৩ হাজার ৬৫০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার।
৯৬ মামলায় ৬৩ আসামি। গ্রেপ্তার ৩০। ২০টির অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও রায় হয়েছে দুটি মামলায়।
২০২৩ সালের ৯ জুন। চট্টগ্রাম নগরের কলাতলী এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। খবর ছিল, সেখানে পাচারের জন্য দুটি বিরল প্রজাতির উল্লুক রাখা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ পৌঁছানোর আগেই প্রাণী দুটি নিয়ে পালিয়ে যান এমরান হোসেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
দুই মাস পর একই বছরের ১২ আগস্ট নগরের বাকলিয়ায় বাঁশভালুক পাচারের অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার হন এমরান। ৩০ অক্টোবর হগ বেজার উদ্ধারের আরেক অভিযানে তাঁর নাম আসে। সেবারও তিনি পালিয়ে যান। প্রায় দেড় বছর পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মাতুয়াইল এলাকা থেকে ১১টি মুখপোড়া হনুমানসহ আবার গ্রেপ্তার হন তিনি।
বন বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে, পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে বন্য প্রাণী সংগ্রহ করে পাচার চক্রের কাছে সরবরাহ করতেন এমরান। কর্মকর্তাদের দাবি, ধরা পড়ার পর জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
শুধু এমরান নন। বন বিভাগের নথি বলছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এমন আরও কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিকবার বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ উঠেছে। কেউ অভিযানের আগেই পালিয়েছেন, কেউ এক মামলার পর আরেক মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, একই ব্যক্তিরা কীভাবে বারবার এ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন?
বন বিভাগ সূত্র বলছে, অবৈধ বাজারে বিরল প্রাণীর দাম ১ থেকে ১০ লাখ টাকা বা আরও বেশি হতে পারে।
গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ৯৬টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৬৫০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার এবং ৯৬টি মামলায় ৬৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৩০ জন। ২০টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও রায় হয়েছে মাত্র দুটি মামলায়। সাজা পেয়েছেন সাতজন আসামি। অর্থাৎ অধিকাংশ মামলা এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে রয়েছে।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, রাজধানী ঢাকাতেও একই চিত্র। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীকেন্দ্রিক ১৪৭টি উদ্ধার অভিযানে ২ হাজার ৮০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ, গন্ধগোকুল, শজারু, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও কচ্ছপ এবং শত শত পাখি। উদ্ধার হয়েছে শিয়ালের কাটা মাথা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও। কর্মকর্তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া প্রাণী পাচারের প্রকৃত চিত্রের সামান্য অংশমাত্র।
পাচারকারী এমরানের মতো একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মো. সাদ্দাম ওরফে জুয়েল ও জগ্লুর বিরুদ্ধে। গত ৩ মে লালখান বাজারে তাঁর বাসা থেকে দুটি চশমাপরা হনুমান উদ্ধারের সময় তিনি পালিয়ে যান। পরে গত রোববার হাটহাজারী থেকে ১৩টি সবুজ টিয়াসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাচার চক্রের আরেক সদস্য হাদিসুর রহমানকে ৮ জুন চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে একটি মুখপোড়া হনুমান, একটি মৃত বানরের বাচ্চা ও ১২টি পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ উদ্ধার হয়। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাদিসুর এর আগেও অন্তত চারবার বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনায় ধরা পড়েছিলেন। তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা বড় একটি পাচার চক্রের অংশ।
বন্য প্রাণী পাচার চক্র চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনে একসময় বাঘসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটত। ধারাবাহিক পদক্ষেপে সেটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্য প্রাণী পাচার বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাহাড় থেকে নগর, তারপর সীমান্ত
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে বন্য প্রাণী পাচারের একটি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় শিকারি বা সংগ্রাহকেরা বন থেকে প্রাণী ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করেন। এরপর প্রাণীগুলো চট্টগ্রাম নগর কিংবা ঢাকার বিভিন্ন বাসা, গুদাম বা ভাড়া করা কক্ষে লুকিয়ে রাখা হয়। ক্রেতার চাহিদা নিশ্চিত হলে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তদন্তে জীবন্ত প্রাণীর একটি অংশ স্থলপথে ভারত ও মিয়ানমারের দিকে নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
চক্র কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, কেন একই ব্যক্তিরা বারবার বন্য প্রাণী পাচারে জড়াচ্ছেন, এর ব্যাখ্যায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রামের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান আইনে অধিকাংশ অপরাধের শাস্তি তুলনামূলক কম এবং মামলার বিচার দীর্ঘ হওয়ায় অনেক আসামি সহজেই জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। হাতি বা বাঘ হত্যায় সাত বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বন্য প্রাণী পাচার সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একজন গ্রেপ্তার হলেও চক্রের অন্য সদস্যরা সক্রিয় থাকে।
ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, পাচারকারী চক্রের তুলনায় বন বিভাগের জনবল ও সক্ষমতা খুবই সীমিত। সারা দেশে বিভাগীয় কার্যালয় মাত্র চারটি আর বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটে কাজ করছেন মাত্র ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁর মতে, শুধু উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নয়, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমেই এ চক্র ভাঙা সম্ভব।
যত বিরল, তত দাম
কেন চশমাপরা হনুমান, উল্লুক, ধনেশ, হাতির মতো বিরল বন্য প্রাণীই পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্য? এর উত্তর মিলছে আন্তর্জাতিক গবেষণায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অরিক্স-এ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বাজারভিত্তিক বন্য প্রাণী বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি অনুসন্ধান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পার্বত্য এলাকার বাজারগুলোয় বিপন্ন প্রজাতির উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। এসব প্রাণীর বড় অংশ জীবিত অবস্থায় নয়; দাঁত, চামড়া, হাড় ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসেবেও বিক্রি হয়। অন্য এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো প্রাণী যত বিরল হয়ে ওঠে, আন্তর্জাতিক অবৈধ বাজারে তার মূল্যও তত বাড়ে। সেই উচ্চমূল্যের লোভই নতুন করে শিকার ও পাচারকে উৎসাহিত করে। বন বিভাগ সূত্র বলছে, অবৈধ বাজারে বিরল প্রাণীর দাম ১ থেকে ১০ লাখ টাকা বা আরও বেশি হতে পারে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান প্রথম আলোকে বলেন, বন্য প্রাণী পাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শুধু প্রাণী উদ্ধার বা দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে এ অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। অর্থের জোগানদাতা, সংগ্রাহক, পরিবহনকারী, বিক্রেতাসহ পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং সীমান্ত ও পরিবহন পথে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।




