জার্মান ফুটবলে আরও একটি অধ্যায়ের অবসান হলো। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল তারা। জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছেন জুলিয়ান নাগেলসমান।

বিশ্বকাপে দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের জের ধরেই এসেছে এই সিদ্ধান্ত। আর তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে গেছেন অভিজ্ঞ কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ।

ফ্রাঙ্কফুর্টে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরে এক হাইভোল্টেজ বৈঠকের পর এই নাটকীয় মোড় নেয়। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর পদ ছাড়তে রাজি হন ৩৮ বছর বয়সী নাগেলসমান। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হানসি ফ্লিকের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া এই কোচের চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ পর্যন্ত। তবে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

একই সঙ্গে জার্মান ফুটবল ভক্তদের জন্য আরও একটি বড় খবর দিয়েছে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটি জানায়, লিভারপুলের সাবেক মাস্টারমাইন্ড ইয়ুর্গেন ক্লপ ইতোমধ্যেই এই গুরুদায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছেন। ক্লপ বর্তমানে বিশ্বকাপ চলাকালে একটি জার্মান টেলিভিশনে বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন।

নাগেলসমানের বিদায়ে জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে জুলিয়ান নাগেলসমানের কাজের জন্য জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তিনি অসাধারণ নিষ্ঠা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও আন্তরিক একজন মানুষ, যাকে আমরা সবাই মূল্যায়ন করি।’

সংস্থার ক্রীড়া পরিচালক রুদি ভোলার-এর কণ্ঠেও ছিল বিদায়ী কোচের প্রতি সমীহ। তিনি বলেন, ‘নাগেলসমান একজন অসাধারণ কোচ ছিলেন এবং থাকবেন। আমি বিশ্বাস করি, তিনি ভবিষ্যতেও সফলতার পথেই এগিয়ে যাবেন।’

জার্মান সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে বোস্টনে প্যারাগুয়ের কাছে আকস্মিক হারের ব্যাখ্যা ডিএফবি কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন নাগেলসমান। এরপরই তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে উৎসাহিত করা হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়ার বিনিময়ে তাকে প্রায় ৭০ লাখ ইউরো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা তার প্রায় এক বছরের বেতনের সমপরিমাণ।

বিদায়বেলায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নাগেলসমানও। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। আমার কাছে সবসময় দলের সাফল্যই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এত বড় হতাশার পর আমি মনে করি, দলটির নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ পাওয়া উচিত।’

প্যারাগুয়ের কাছে এই হার জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কালো অধ্যায় হয়ে রইল। ২০১৪ সালে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আর নিজেদের নামের প্রতি বিচার করতে পারেনি। এমনকি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম টাইব্রেকারে পরাজিত হয়ে বিদায় নিতে হলো জার্মানিকে। এর আগে নাগেলসমানের অধীনেই ঘরের মাঠে ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা।

সবকিছু ঠিক থাকলে জার্মানিকে নতুন স্বপ্ন দেখানোর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ৫৯ বছর বয়সী ইয়ুর্গেন ক্লপ। ২০২৩-২৪ মৌসুম শেষে লিভারপুল ছাড়ার পর থেকে কোচিংয়ের বাইরে আছেন তিনি। তার অধীনেই লিভারপুল প্রিমিয়ার লিগ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল। অ্যানফিল্ড ছাড়ার পর তিনি রেড বুলের গ্লোবাল ফুটবল বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন।

নাগেলসমানের এই আকস্মিক বিদায় সাড়া ফেলেছে জার্মান রাজনৈতিক মহলেও। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ-এর মুখপাত্র এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চ্যান্সেলর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে জুলিয়ান নাগেলসমানের নিষ্ঠা ও অবদানের জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’

নাগেলসমানের বিদায় আর ক্লপের সম্ভাব্য আগমন, জার্মান ফুটবল এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।