বর্তমানে দেশের আদালতগুলো মাদক মামলায় সয়লাব হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত দায়ের হাচ্ছে শত শত মামলা। তবে মামলার চার্জশিট দিতে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বিচারক সংকটসহ নানা কারণে ঝুলে আছে বিচার। সারা দেশে যে হারে মামলা হচ্ছে, সেই অনুপাতে নিষ্পত্তির সংখ্যা খুবই কম। এতে বিচার ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে বিচারাধীন মাদক মামলা আছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৬টি; যা ২০১৮ সালে ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৪টি। গত আট বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার ১৮২টি মামলা। গত তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬ হাজার ২৬০টি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে ২৩৬টি মামলা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকার ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে বেশি ৮১ হাজার ১৩৯টি মাদক মামলা বিচারাধীন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ৩৯ হাজার ৬৫৭টি মামলা। তৃতীয় অবস্থানে রাজশাহী ট্রাইব্যুনালে মামলা ২৬ হাজার ৩৪৯টি। এরপর নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও কক্সবাজার আদালতে অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি মামলা রয়েছে। মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতির ফলে মামলার জট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি জামিন না পাওয়ায় কারাগারগুলোতে বন্দিদের চাপ বাড়ছে। আবার আসামিরা জামিন নিয়ে বেরিয়ে ফের মাদক বাণিজ্যে যুক্ত হচ্ছে। ফলে মাদক নির্মূলে সরকারের মূল উদ্দেশ্য বিফলে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদের হাতে আধুনিক অস্ত্র দিতে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত শুক্রবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সংশোধনী প্রস্তাব করেছি, তাতে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত থাকবে। পাশাপাশি মামলার সংখ্যা বিবেচনায় সরকার যেখানে মনে করবে ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করবে।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় যত মামলা হয়, তার মধ্যে ৪৫ শতাংশের বেশিই মাদকসংক্রান্ত। সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবসহ নানা জটিলতায় এসব মামলা বছরের পর বছর ঝুলছে। এ সুযোগে প্রায় ৯০ শতাংশ আসামি জামিন বা খালাস পাওয়ায় মামলার ভবিষ্যৎ অশ্চিয়তায় পড়েছে। ২০১০-১১ সালের পর যখন সারা দেশ ইয়াবায় সয়লাব হয়, এরপর থেকে মাদক মামলার সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। দেশের মাদকের ভয়াবহ অবস্থা বিবেচনা করে ২০১৩ সালের ৩ মার্চ মাদক মামলায় দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে পৃথক বিচারিক আদালত গঠনের প্রস্তাবও দেয় পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তখন বলা হয়েছিল, ৪৮ হাজার মাদকের মামলার বিচার শেষ করতে অন্তত ২০ বছর লাগবে। সংকট দ্রুত সমাধানে জেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। ২০১৯ সালে সব মাদক মামলা ছয় মাসে নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। কিন্তু তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি, বরং বেড়েছে মামলার সংখ্যা।
এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ রানা যুগান্তরকে বলেন, দেশে মাদকসেবী ও মাদক কারবারির পাশাপাশি মাদক মামলাও বেড়েছে। এটা উদ্বেগজনক। সাক্ষীর অভাব ও তদন্তে গাফিলতির কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে, মাদকসহ আটক হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে হবে। অথচ গত পাঁচ বছরে মাত্র ৮৫ হাজার ৯৯১টি মামলা বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে।








