ফুটবলের ইতিহাস নানা ঘটনার মিলনরেখায় লেখা। আর আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর জীবনও ছিল তেমনই এক গল্প। আর্জেন্টিনায় জন্ম হলেও পরে তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং গত শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবল কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সাফল্য পেলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুর্ভাগ্য যেন তাকে সারাজীবন বিশ্বকাপ থেকে দূরে রেখেছিল। ১৯৫০ ও ১৯৫৪ সালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা, আর ১৯৬২ সালে চোটের কারণে তিনি কখনোই বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে পারেননি।
তার জন্মের এক শতাব্দী পর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে সেই দুই দেশ—আর্জেন্টিনা ও স্পেন—বিশ্বসেরার মুকুট নির্ধারণে মুখোমুখি হতে চলেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের এই ফাইনাল যেন সেই ম্যাচ, যেটি খেলার সুযোগ আলফ্রেডো ডি স্টেফানো সারা জীবনেও পাননি।
রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ড ক্লাবটির হয়ে ৩০০টিরও বেশি গোল করেছেন। বুয়েনস আইরেসের বারাকাস এলাকায় জন্ম নেওয়া এই তারকা তার গতি, ড্রিবলিং দক্ষতা, শারীরিক সামর্থ্য এবং গোল করার অদম্য ক্ষুধা দিয়ে বিশ্বের দুই গোলার্ধের ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছিলেন।
'সোনালি তীর' (দ্য ব্লন্ড অ্যারো) নামে পরিচিত ডি স্টেফানো আর্জেন্টাইন ক্লাব রিভার প্লেট ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার পর ক্লাবটিকে টানা পাঁচটি লিগ শিরোপা জিতিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ক্লাব পর্যায়ে সফল হওয়ার পাশাপাশি তিনি যেসব দেশের হয়ে খেলেছেন, তাদের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতেও ছিলেন সমান আগ্রহী। ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া ও স্পেন—এই তিনটি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার বিরল কীর্তি গড়েন তিনি। দক্ষিণ আমেরিকায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সংক্ষিপ্ত; আর্জেন্টিনার হয়ে মাত্র ছয়টি এবং কলম্বিয়ার হয়ে চারটি আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলেন।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেই দেশ তাকে প্রকৃত খ্যাতি এনে দেয়, সেই স্পেনের হয়েই তিনি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেন। স্পেনের জার্সিতে ৩১টি ম্যাচে ২৩ গোল করে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের কাতারে জায়গা করে নেন তিনি। কিন্তু এত সাফল্য ও ফুটবল জাদু দেখিয়েও কোনো জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাননি। ১৯৫০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ না করা থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালে চোট—বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর বিশ্বকাপ তার অধরাই থেকে যায়।
আর্জেন্টিনার দৈনিক ক্লারিন-এর সাংবাদিক এবং 'ডি স্টেফানো: দ্য ফার্স্ট আলফ্রেডো অব রিভার' গ্রন্থের লেখক ম্যাক্সি ক্রোনেমবার্গের মতে, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় না খেলেও কিংবা শিরোপা না জিতলেও ডি স্টেফানোর মহত্ত্বে কোনো ঘাটতি পড়ে না। তার বিশ্বাস, তিনি এখনো ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের একজন।
তিনি বলেন, ‘ডি স্টেফানোর মহত্ত্ব কখনো মুছে ফেলা যাবে না। তিনি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে টানা পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেছেন। অবশ্যই বিশ্বকাপ জিততে পারলে সেটি তার ক্যারিয়ারের মুকুটে আরেকটি রত্ন হতো। কিন্তু তাতেও তার মর্যাদা বদলায় না। তিনি আগেই সর্বকালের সেরাদের একজন ছিলেন। তিনি মেসির মতোই প্রায় সবকিছুই জয় করেছেন।‘
ক্রোনেমবার্গ আরও বলেন, ডি স্টেফানোর ফুটবলীয় বিকাশে আর্জেন্টাইন ফুটবলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তার ড্রিবলিং, গোল করার প্রবণতা এবং খেলার ধরণ—সবকিছুতেই আর্জেন্টাইন ফুটবলের ছাপ ছিল। রিভার প্লেটে সফল সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাই পরে মাদ্রিদে তার অসাধারণ সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
তার ভাষায়, ‘ডি স্টেফানোর খেলার ধরন পুরোপুরি আর্জেন্টাইন ফুটবলের পরিচয় বহন করে। গতি, 'গামবেতা' বা ড্রিবলিং—এসবই ছিল তার বড় শক্তি। তার শারীরিক সক্ষমতা ও এসব গুণ একসঙ্গে মিলে তাকে ইউরোপে সফল হওয়ার জন্য আদর্শ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছিল।‘
শেষে এই লেখক মতামত দেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে বেঁচে থাকলে ডি স্টেফানো কাকে সমর্থন করতেন। আর্জেন্টাইন এই লেখকের বিশ্বাস, রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি নিজের জন্মভূমি আর্জেন্টিনার পক্ষেই থাকতেন, কারণ সেখানেই তার পরিচয় ও ফুটবল দর্শনের শিকড়।
তিনি বলেন, ‘ডি স্টেফানো আর্জেন্টাইন ফুটবলেরই সৃষ্টি, আর্জেন্টিনার অপেশাদার ফুটবল থেকেই তার উত্থান। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে অবশ্যই আর্জেন্টিনাকেই সমর্থন করতেন। তিনিই আর্জেন্টাইন ফুটবলকে রিয়াল মাদ্রিদে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সে সময় বিশ্বের সেরা দলে নিজেকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।‘
আরএএইচইউএল/এসকেডি/এএসএম








