‘আগে কয়েক মিনিটের মধ্যেই একবারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস নিতে পারতাম। সে গ্যাসে বেশ কয়েকটি ট্রিপ মারতাম। কিন্তু এখন কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পরও প্রেসার না থাকায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা গ্যাস পাওয়া যায়। এতে করে দু-এক ট্রিপ মারার পর যাত্রী নিয়ে দূরে কোথাও ভাড়া যেতে ভয় লাগে। পরে না আবার গাড়ি ঠেলে গ্যারেজে ফিরতে হয়।’

শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর মগবাজারের একটি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষাকালে কথাগুলো বলছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রুহুল আমিন।

এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যার কারণে সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন।

গত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে তীব্র গ্যাস সংকট বিরাজ করছে। দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না চালকরা। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, কোথাও আবার নির্ধারিত পরিমাণ দেওয়ার আগেই সরবরাহ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় গ্যাসচালিত গাড়ির ওপর যাদের আয়-রোজগার নির্ভরশীল, তেমন মালিক ও চালকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাইভেট কারের চালকরা। তবে যাদের বিকল্প জ্বালানি তেল ব্যবহারের সুযোগ আছে তাদের সমস্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটা কম।

ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের জন্য অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন/ছবি: জাগো নিউজ 

দিনে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হচ্ছে

একাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে ও চালকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আগে একবার গ্যাস নিলেই সারাদিন গাড়ি চালাতে পারতেন। এখন একই গাড়িতে দিনে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়েই কেটে যাচ্ছে কর্মঘণ্টা। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে তেমনি কমে যাচ্ছে দৈনিক আয়। আয় কমে যাওয়ায় তাদের কারও কারও নিত্যদিনের সংসার চালাতেই কষ্ট হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি রোগী পরিবহনেও তৈরি হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব।

ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই অসংখ্য প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক চালক দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে দিনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে শুধু গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টায়।

আরও পড়ুন

‘গ্যাস সংকট হলেই এলোমেলো পুরো সংসার’

গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, সংকট কাটছে না দ্রুত

রোজগার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সংসারে

রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে গিয়ে ডানে ও বাঁয়ে দুদিকেই অটোরিকশার দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। সারিতে গাড়ি রেখে চালকদের কেউ আসনে বসে ঘুমাচ্ছেন, কেউ মাটিতে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন, কেউবা অপেক্ষার সময়টুকু কাজে লাগাতে গাড়ি ধুয়ামুছা করছেন।

আবুল হোসেন নামের এক চালক বলেন, ‘গতকাল টিটিপাড়ার সামনে একটি গ্যাস স্টেশনে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাইনি। আজ আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। আগে একবার নিলে সারাদিন যাইতোগা। এখন দুইবার-তিনবার নেওয়া লাগে। লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হওয়ার কারণে আগের মতো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

অপেক্ষার সময়টুকু কাজে লাগাতে গাড়ি ধুয়ামুছার কাজ করছেন এক চালক/ছবি: জাগো নিউজ

আবদুস সামাদ নামের আরেক চালক বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আয়-রোজগার কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি সংসারে পড়েছে। গ্যাস না পাওয়ায় রোজগার কমলেও মালিকের জমা ১১শ থেকে ১২শ টাকা তো কম দেওয়া যাবে না। এরপর নিজের আয়। মাসের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। মাসটা শেষ হলেই বাড়িভাড়া ও ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন। এছাড়া প্রতিদিনের বাজারসদাই তো আছেই। সব মিলিয়ে মহাবিপদে পড়েছি।’

জরুরি সেবাও পড়েছে সংকটে

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে অ্যাম্বুলেন্স সেবাতেও। চালকরা জানান, রোগী পরিবহনের মাঝপথে কিংবা দায়িত্ব পালনের আগে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

মাসের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। মাসটা শেষ হলেই বাড়িভাড়া ও ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন। এছাড়া প্রতিদিনের বাজারসদাই তো আছেই। সব মিলিয়ে মহাবিপদে পড়েছি।- অটোরিকশার চালক আবদুস সামাদ

অ্যাম্বুলেন্সের এক চালক বলেন, ‘আগে একটা বড় সিলিন্ডারে একবারে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যেত। এখন সেখানে মাত্র এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন পাম্পে আগে গ্যাসের প্রেসার ২০০ (পিএসআই) থাকলেও এখন তা কমে কোথাও ১০০ বা ১১০। আবার কোনো পাম্পে ৬০ থেকে ৭০। এ কারণে সারাদিনে এক ট্রিপ থেকে দুই ট্রিপ দিতে পারি কোনোরকমে। আর গ্যাস মনে করেন অতটা পাওয়া যায় না।’

অন্যদিকে শামীম হোসেন নামের একজন প্রাইভেট কারচালক বলেন, ‘যে মালিকের গাড়ি চালাই তিনি বড় কোম্পানিতে চাকরি করেন। গ্যাস না থাকলেও তেমন সমস্যা হয় না, তেলে চালান। গত তিন থেকে চারদিন ধরে গ্যাস নিতে খুব সমস্যা হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অল্প টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।’

আরও পড়ুন

গ্যাস-জ্বালানি সংকট, লিথিয়াম প্রযুক্তির ভূমিকা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

রাত কেটে যায় গ্যাসের লাইনে, ‘দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা’ বলছেন ভুক্তভোগীরা

কারিগরি সমস্যার কারণে কমেছে গ্যাস সরবরাহ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যার কারণে সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন।

লাইনে অটোরিকশা রেখে ফোনে কথা বলছেন এক অটোচালক/ছবি: জাগো নিউজ

টার্মিনালটি মেরামত করে দ্রুত চালু করতে দেশি-বিদেশি টেকনিক্যাল টিম নিরলসভাবে কাজ করছে। শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যত দ্রুত সম্ভব মেরামত কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো নতুন আপডেট পাওয়া গেলে পরবর্তীতে জানানো হবে। সাময়িক এ অসুবিধার জন্য গ্যাস গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে পেট্রোবাংলা।

এমইউ/একিউএফ