রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাসের গাছ হরিলুটের ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হকের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ফলজ ও বনজ গাছ কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। ক্যাম্পাসের ভূমি উন্নয়নকাজ চলমান অবস্থায় দুর্নীতির এ ঘটনা ঘটে। রামেবি, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য। গাছ লোপাটের প্রমাণাদি যুগান্তরের হাতে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের জুনে রামেবি ক্যাম্পাসের জন্য ব্যক্তিমালিকনাধীন ২০৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ হয়। এ সময় জেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগ যৌথ জরিপ করে ওই জমিতে থাকা ২৫ হাজার ৮৪২টি ফলজ ও বনজ গাছ তালিকাভুক্ত করে। অধিগ্রহণকৃত জমি ভবন নির্মাণের উপযোগী করার জন্য গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাটি ও বালু ভরাটের কাজ শুরু হয়। ভরাটের কাজ শুরু হলেই বন বিভাগের অনুমতি এবং নিলাম ছাড়াই কৌশলে গোপনে গাছ কাটা শুরু হয়। এ সময় আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, নিম, অর্জুন, কড়ই, তেঁতুল, সেগুনসহ মূল্যবান গাছ গোপনে বিক্রি করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সবার নজরে এলে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়।
এতে বেকায়দায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১ হাজার ৮৫৩টি গাছ নিলামে বিক্রি করা হয়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় বিক্রি হয় ৭১৩টি গাছ। সর্বশেষ মে মাসে তৃতীয় দফায় ৭৬টি গাছ নিলাম হয়। তিন দফায় মোট ২ হাজার ৬৪২টি গাছ বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা হয় মাত্র ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
রোববার বিকালে রামেবি ক্যাম্পাসে দেখা যায়, আম ও মেহগনি মিলে ক্যাম্পাসের কয়েকটি স্থানে এখন সর্বোচ্চ ৫০০ গাছ রয়েছে। নিলামকৃত ২ হাজার ৬৪২টির সঙ্গে বিদ্যমান ৫০০ গাছ যোগ করলে ৩ হাজার ১৪২টি গাছের হিসাব পাওয়া যায়। তালিকাভুক্ত গাছের সংখ্যা থেকে নিলাম ও বিদ্যমান গাছ বাদ দিলে ২২ হাজার ৭০০টি গাছের হদিস মেলেনি। বিপুল সংখ্যার এ গাছ কোথায় গেল, সেই প্রশ্নই সবার মুখে।
জানা যায়, অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের গাছের মূল্য বাবদ জেলা প্রশাসন ২ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেছে। যদিও নিলামকৃত গাছের ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে সরকারি কোষাগারে। এদিকে নিলামের মূল্য অনুযায়ী বিদ্যমান ৫০০ গাছের আনুমানিক দাম আছে পাঁচ লাখ টাকা। ফলে নিলামসহ বিদ্যমান গাছের সর্বমোট মূল্য দাঁড়ায় ৩৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। জেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগের নির্ধারিত মূল্য থেকে নিলাম ও বিদ্যমান গাছের মূল্য বাদ দিলে লোপাট করা হয়েছে ২ কোটি ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
জানা যায়, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১০ সেপ্টেম্বর উপাচার্য হিসাবে যোগদান করেন অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক। এরপর তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। এরপরই ক্যাম্পাসের গাছ লুট, গুপ্ত টেন্ডারে আম বিক্রি, ক্যাম্পাসের জমি এবং পুকুর লিজ না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিষয়গুলো নিয়ে যুগান্তরসহ একাধিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য জাওয়াদুল হক এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে বিধি লঙ্ঘন করে নবম গ্রেডের সেকশন অফিসার নাজমুল হোসেনকে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করেন। তাকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসাবে উপাচার্য তার পার্সোনাল সেক্রেটারি (পিএস) পদে বসান। এরপরেই পিএস নাজমুল হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটে উপাচার্যের প্রধান সহযোগী হিসাবে কাজ শুরু করেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপাচার্য জাওয়াদুল হক। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ৫১ শতাংশ অবকাঠামো এবং ৪৯ শতাংশ গ্রিন থাকবে। সেভাবেই গাছ কাটা হয়েছে। নিলাম ছাড়া গোপনে গাছ বিক্রি করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। বাস্তবে ক্যাম্পাসে এখনো অনেক গাছ আছে। তবে বিষয়টি নিয়ে ভালো বলতে পারবে প্রকৌশল দপ্তর।’








