—ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের কর্মীদের শেয়ার বিক্রির অর্থ আবাসন বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি করেছে।
—মে মাসে সান ফ্রান্সিসকোয় আবাসিক সম্পত্তির মধ্যম বিক্রয়মূল্য রেকর্ড ১৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
—এআই খাতের বাইরে থাকা অনেক পরিবার বাড়ির উচ্চমূল্যের কারণে শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর অভিজাত আবাসিক এলাকা ডুবোস ট্রায়াঙ্গেলে গাছপালায় ঘেরা এক শান্ত সড়কে সম্প্রতি একটি অ্যাপার্টমেন্ট ঘিরে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। তিন শয়নকক্ষের ওই ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অন্য বিষয়। বিক্রেতা নগদের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের শেয়ারও মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে নিতে আগ্রহী ছিলেন।
ফ্ল্যাটটি দেখে বেরিয়ে আসা ওপেনএআইয়ের একজন তরুণ কর্মী বলেন, সম্পত্তিটির মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে তিনি এটি কিনতে চান। দুই বছর আগে প্রযুক্তি খাতের একটি চাকরির জন্য তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় আসেন এবং বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকেন। শেয়ার দিয়ে ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
এ দৃশ্যই যেন ২০২৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর নতুন বাস্তবতা। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুই এআই প্রতিষ্ঠান-ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সদর দপ্তর এই শহরে। এআই বিপ্লবের কেন্দ্র হয়ে ওঠা সান ফ্রান্সিসকোয় চলতি বছর আবাসন বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে অস্বাভাবিক হারে।
আবাসন প্রতিষ্ঠান রেডফিনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড্যারিল ফেয়ারওয়েদার বলেন, ‘দাম এখন সত্যিই আকাশছোঁয়া। মানুষের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ, আর তাঁরা বাড়ি কিনতে প্রস্তুত।’
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের অবস্থান আবারও ফিরে পায় সান ফ্রান্সিসকো। এ ক্ষেত্রে ৫০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত সিলিকন ভ্যালির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী শহর সান হোসেকে পেছনে ফেলেছে শহরটি।
রেডফিনের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে সান ফ্রান্সিসকোয় আবাসিক সম্পত্তির মধ্যম বিক্রয়মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিলে বেড়েছে সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং মে মাসে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ।
গত মে মাসে শহরটিতে আবাসিক সম্পত্তির মধ্যম বিক্রয়মূল্য রেকর্ড ১৭ লাখ ৬০ হাজার ডলারে পৌঁছায়। অথচ একই সময়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে কি না, আবাসিক সম্পত্তির মধ্যম মূল্য ছিল প্রায় চার লাখ ডলার। জাতীয়ভাবে মার্চে বাড়ির দাম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এপ্রিল ও মে মাসে বেড়েছে ২ শতাংশ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ এআই শিল্প থেকে আসা নতুন সম্পদ।
অর্থনীতিবিদ ড্যারিল ফেয়ারওয়েদার বলেন, ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকেই সান ফ্রান্সিসকো বে-এরিয়ার বিলাসবহুল আবাসিক এলাকায় বাড়ির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ডুবোস ট্রায়াঙ্গেলের মতো এলাকাও এর বাইরে নয়। তবে এআই শিল্পের প্রভাব কম এমন শহরগুলোয় একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়নি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় সান ফ্রান্সিসকোর আবাসন বাজারে যে মন্দা তৈরি হয়েছিল, এআই-নির্ভর নতুন সম্পদের প্রবাহ তা পাল্টে দিয়েছে। এআই খাতের দক্ষ কর্মীদের বেতন ও যোগদান-বোনাস এখন সিলিকন ভ্যালির প্রচলিত মানদণ্ডও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধা এসেছে কর্মীদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির সুযোগ থেকে।
গত বছরের অক্টোবরে ওপেনএআইয়ের বর্তমান ও সাবেক ৬০০-এর বেশি কর্মী সম্মিলিতভাবে ৬৬০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করেন। তাতে প্রত্যেকে গড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার করে পেয়েছেন। অন্যদিকে, ক্লদ এআই মডেলের নির্মাতা অ্যানথ্রপিকের কর্মীরাও সম্প্রতি প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক—দুই প্রতিষ্ঠানই চলতি বছর বা আগামী বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আরও বহু কর্মী কোটিপতি হতে পারেন। ফলে আবাসন বাজারের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ডুবোস ট্রায়াঙ্গেলের ওই ফ্ল্যাটের বিক্রয়-এজেন্ট র্যাচেল সোয়ান বলেন, ‘আজ যেসব দর প্রতিযোগিতা চলছে, কয়েক বছর পর সেগুলোকে সস্তা চুক্তি বলেই মনে হবে। আসলে এখনই তা মনে হচ্ছে।’
তবে সবাই সমান আশাবাদী নন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এনরিকো মোরেত্তি মনে করেন, এআই-বুম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর মতে, শহরের জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান এখনো মহামারির আগের পর্যায়ে ফেরেনি। পাশাপাশি বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, যেমন মেটা, সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করেছে। ভবিষ্যতে এআই শিল্প পরিণত পর্যায়ে গেলে বিশেষজ্ঞ কর্মীর চাহিদা কমে আসতে পারে এবং বর্তমানের মতো উচ্চ বেতনও নাও থাকতে পারে।
এনরিকো মোরেত্তির মতে, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি থেকে সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত কর্মীদের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে থাকা বিনিয়োগকারীদের হাতেই যাবে।
এদিকে, ২০ বছরের অভিজ্ঞ রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ম্যাথিউ গুলডেন বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘পাগলাটে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, গত বছরের শেষ দিক থেকে সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যাদের বড় অংশই এআই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
এই প্রবণতা শুধু বিলাসবহুল বাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। একক পরিবারের বাড়ি থেকে শুরু করে এক শয়নকক্ষের ছোট ফ্ল্যাট—সব ধরনের সম্পত্তির চাহিদা বেড়েছে। দামি বাড়ির ক্ষেত্রে পুরো মূল্য একবারে পরিশোধ করে কেনার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। স্কুলপড়ুয়া সন্তান থাকা সান ফ্রান্সিসকোর দুটি পরিবার সম্প্রতি বড় বাড়ি কেনার চেষ্টা করে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাঁরা কথা বলেন।
দুটি পরিবারেরই বড় বাড়ির প্রয়োজন ছিল। তবে ওপেনএআইয়ে কর্মরত একজনের পরিবার গত অক্টোবরে কিছু শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া অর্থে পছন্দের এলাকায় পুরো মূল্য একবারে পরিশোধ করে বাড়ি কিনতে সক্ষম হয়। তাঁদের ভাষায়, ‘এআইয়ের অর্থের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের একধরনের দ্বিধা ও অস্বস্তি কাজ করে। আমরা বিলাসী মানুষ নই। শুধু যে সুযোগটি এসেছে, সেটাই কাজে লাগিয়েছি।’
অন্যদিকে প্রযুক্তি বা এআই খাতের বাইরে কর্মরত একটি পরিবার সান ফ্রান্সিসকো ছেড়ে বে-এরিয়ার উত্তরের একটি শহরতলিতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। পরিবারের কর্তা, যিনি সান ফ্রান্সিসকোর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ পদে কর্মরত, তাঁকে এখন প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করতে হয়।
পরিবারটির মা বলেন, ‘সামর্থ্য থাকলে আমরা কখনোই শহর ছেড়ে যেতাম না। সত্যি বলতে, এআই থেকে আসা অতিরিক্ত অর্থ যেভাবে অন্যদের শহরের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা দেখে খারাপই লাগে।’
শেষ পর্যন্ত ডুবোস ট্রায়াঙ্গেলের সেই ফ্ল্যাটটি বিক্রি হয়েছে ৩২ লাখ ডলারে, যা চাওয়া দামের চেয়ে দুই লাখ ডলার বেশি। তবে মূল্য পরিশোধে এআই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।








