কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শুধু লেখা বা ছবিই তৈরি করছে না, এটি কঠিন সব গণিতের প্রমাণও লিখছে। এমনকি অসম্ভব মনে হওয়া কিছু সমস্যারও সমাধান দিচ্ছে দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এআই যদি এমন কোনো প্রমাণ দেয়, যা আপাতদৃষ্টিতে দেখতে নিখুঁত, কিন্তু সেই গাণিতিক প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে মানুষের পক্ষে তা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়; তাহলে আমরা কীভাবে জানব যে সেটি আসলেই সত্য?

এআই এমন জটিল, দীর্ঘ ও আত্মবিশ্বাসী প্রমাণ লিখতে পারে, যা দেখে পাঠকের মনে হতে পারে, ‘আমি যদিও বুঝিনি, তবে হয়তো ঠিকই আছে।’ অর্থাৎ, প্রমাণের আসল শক্তি দিয়ে নয়; বরং এর ভাষা, ভঙ্গি ও জটিলতা দিয়ে এআই মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে দিতে পারে যে তার উত্তরটিই সঠিক। একে বলে প্রুফ বাই ইন্টিমিডেশন।

২০২৫ সালে কয়েকজন শীর্ষ গণিতবিদ গোপনে একত্র হয়ে ওপেনএআইয়ের একটি রিজনিং মডেল পরীক্ষা করেন। বিজ্ঞানীরা এআইকে এমন সব কঠিন ও নতুন গাণিতিক সমস্যা দেন, যেগুলোর সমাধান ইন্টারনেটে ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এআই এমন সব সমাধান দেয়, যা দেখে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা রীতিমতো অবাক হয়ে যান! কেউ কেউ এআইয়ের এই কাজকে খুব ভালো একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীর কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে দেখুন: যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সভায় এআইয়ের কাছে হারল গণিতবিদেরা

৩,৫০০ বছর আগের হাতের লেখা পড়ে ফেলল এআই
প্রমাণের আসল শক্তি দিয়ে নয়; বরং এর ভাষা, ভঙ্গি ও জটিলতা দিয়ে এআই মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে দিতে পারে যে তার উত্তরটিই সঠিক। একে বলে প্রুফ বাই ইন্টিমিডেশন।

তবে এতে একটি সমস্যা আছে। দেখতে ঠিক, কিন্তু ভেতরে ভুল গণিতের ক্ষেত্রে একটি ছোট্ট ভুলও পুরো প্রমাণকে বাতিল করে দিতে পারে। এআই অনেক সময় এমন যুক্তি দেয়, যা বাইরে থেকে দেখতে একদম ঠিক মনে হয়, কিন্তু গভীরভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, ভেতরে যৌক্তিক ফাঁক থেকে গেছে।

অতিরিক্ত জটিলতা এআইয়ের দেওয়া প্রমাণ এতটাই বড় বা জটিল হতে পারে যে মানুষ পুরোটা যাচাই করে দেখার আগ্রহই হারিয়ে ফেলতে পারে। আত্মবিশ্বাসের প্রভাব এআই ভুল করলেও তা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যা সাধারণ পাঠক বা পেশাদার গণিতবিদদেরও বিভ্রান্ত করতে সক্ষম।

তাহলে গণিতবিদেরা এর সমাধান কী ভাবছেন? অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভবিষ্যতে এআইয়ের তৈরি করা প্রমাণকে ফরমাল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। যেমন, লিনের মতো প্রুফ-অ্যাসিস্ট্যান্ট সফটওয়্যার, যা প্রমাণের প্রতিটি ধাপ যৌক্তিকভাবে পরীক্ষা করে। এর মাধ্যমে সমাধানটি কেবল দেখতে সঠিক কি না, তা নয়; বরং সত্যিই সেটি নির্ভুল কি না, তা যাচাই করা যায়।

এআই প্রায় অর্ধেক সময় ভুল স্বাস্থ্য পরামর্শ দেয়, নতুন গবেষণা
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভবিষ্যতে এআইয়ের তৈরি করা প্রমাণকে ফরমাল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। যেমন, লিনের মতো প্রুফ-অ্যাসিস্ট্যান্ট সফটওয়্যার।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এআই কি গণিতবিদদের হারিয়ে দেবে? হয়তো এখনই নয়। বর্তমান এআই এখনো ভুল করে, নতুন গাণিতিক ধারণা তৈরিতেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং এর কাজের জন্য মানুষের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন হয়। সব ক্ষেত্রের গবেষণা-স্তরের সমস্যা এটি এখনো একা সমাধান করতে পারে না। তবে এটি গণিতবিদদের জন্য অত্যন্ত দ্রুত একটি শক্তিশালী সহকারী হয়ে উঠছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন…ধরুন, এআই একটি সঠিক প্রমাণ দিল। কিন্তু মানুষের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সেটি পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না। তাহলে সেটিকে কি আমরা ‘জানা’ বলতে পারব? গণিত কি শুধু একটি সত্য ফলাফল বের করার নাম, নাকি এটি মানুষের বোঝাপড়ারও বিষয়? নতুন করে এখন এই দার্শনিক প্রশ্নটিই সামনে উঠে আসছে।

মোদ্দাকথা, এআই হয়তো গণিত গবেষণার গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেবে। কিন্তু গণিতের মূল আত্মা এখনো মানুষেরই হাতে। তা হলো প্রশ্ন করা, বোঝা, সন্দেহ করা এবং যাচাই করা। কারণ গণিতের জগতে কেবল উত্তর পাওয়াই যথেষ্ট নয়; উত্তরটি কেন সত্য, তা বুঝতে পারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

এআই হাইপ, ভবিষ্যদ্বাণী ও অদৃশ্য প্রতারণার রাজনীতি