ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় ২০২৫ সালে আলোচনায় উঠে আসে উপকূলীয় জেলা বরগুনা। আক্রান্ত হন ১০ হাজারের বেশি মানুষ, প্রাণ হারান ৫৮ জন। স্বাস্থ্য বিভাগ বরগুনাকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারো বাড়ছে ডেঙ্গুর শঙ্কা।
যদিও জেলা প্রশাসনের দাবি, আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
‘গত বছর বরগুনায় প্রতি ঘরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল। সেসময় ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রথমদিকে কোনো ব্যবস্থায় নেয়নি প্রশাসন। এ বছর আমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। আমরা শুধু দেখি সরকারি অফিস ও তাদের আবাসিক কোয়ার্টারে ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধন করতে।’
গত বছরের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বরগুনায় ‘ব্রেটো ইনডেক্স’ বেশি থাকা এলাকায় লার্ভা ধ্বংস, নিয়মিত ফগিং, জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো, পানি সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সুপারিশের অনেকগুলোই এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
আরও পড়ুন
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু
বরগুনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর এপ্রিলের শুরু থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩০ জুনের মধ্যে আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯৩২ জন এবং ৩১ জুলাই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৮৬০ জনে। শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হন এক হাজার ৯২৮ জন। বছরের শেষ দিকে সরকারি হিসাবেই আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় তিন গুণ ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
‘আমাদের গ্রামে কখনো মশক নিধন কার্যক্রম হয়নি। আমি গতকাল (মঙ্গলবার) সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখানে একজন মাত্র মেডিসিনের ডাক্তার আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসার কোনো ওষুধ সরবরাহ নেই।’
চলতি বছর পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২২৮ জন। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১০৬ জন। এছাড়া এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে বরগুনা পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে বর্জ্য জমে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আর তাতেই বংশবিস্তার করছে এডিসের লার্ভা। এছাড়া বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে আছে। তবে অনেক বাড়িতেই এবার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পর ঢেকে রাখা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব অসহনীয় হয়ে উঠছে। মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে দিনে-রাতে মশার কয়েল ব্যবহার করতে হচ্ছে। অনেকেই শিশুদের মশারির ভেতরে রাখছেন।
আরও পড়ুন
জিগাতলায় নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা, লাখ টাকা জরিমানা
বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের দক্ষিণ মনষাতলী এলাকায় গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর আমার পরিবারের পাঁচজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিতে হয়েছিল এবং অবস্থা এমন ছিল যে আমাকে একদিন আইসিইউতে থাকতে হয়েছে। এছাড়া আমাদের এলাকাটিতে এত বেশি সংক্রমণ ছড়িয়েছিল যে স্থানীয়ভাবে এটি ‘ডেঙ্গু কলোনি’ হিসেবে পরিচিতি পায়।’
‘আবারো যদি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বরগুনায় বেড়ে যায়, তবে এটি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা এখন আর বরগুনায় নেই। কারণ বরগুনার প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চিকিৎসাসেবা দেওয়া বরগুনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ অনেকগুলোই শূন্য।’
মশক নিধন শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের অফিস আদালতে সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ করে পুলিশ লাইন এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম নাভিল জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর বরগুনায় প্রতি ঘরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল। সেসময় ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রথমদিকে কোনো ব্যবস্থায় নেয়নি প্রশাসন। এ বছর আমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। আমরা শুধু দেখি সরকারি অফিস ও তাদের আবাসিক কোয়ার্টারে ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধন করতে।’
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি থেকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আব্দুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের গ্রামে কখনো মশক নিধন কার্যক্রম হয়নি। আমি গতকাল (মঙ্গলবার) সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখানে একজন মাত্র মেডিসিনের ডাক্তার আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসার কোনো ওষুধ সরবরাহ নেই। ডাক্তার ওষুধ লিখে দিলে আমাদের বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। সরকারের কাছে দাবি জানাই যেন ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়।’
আরও পড়ুন
চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৫ হাজার ছাড়ালো
শহরে সীমিত আকারে মশক নিধন কার্যক্রম চললেও গ্রামের অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর উদ্যোগ নেই জানিয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরগুনার সাবেক সভাপতি মনির হোসেন কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘বরগুনায় আবারো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এতে জেলাজুড়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আবারো যদি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বরগুনায় বেড়ে যায়, তবে এটি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা এখন আর বরগুনায় নেই। কারণ বরগুনার প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বেশি চিকিৎসাসেবা দেওয়া বরগুনা সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ অনেকগুলোই শূন্য। আর নতুন করে কোনো চিকিৎসকও পদয়নও হয়নি। মহামারি আকার ধারণ করলে চিকিৎসা সেবা না পাওয়া ও প্রাণহানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।’
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. আশিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আগে শুরু হয়েছিল। এ বছর এখনো শুরু না হলেও সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই মৌসুমের শুরুতেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল যারা চিকিৎসা নিতে আসছেন সবাই এ ক্যাটাগরি রোগী। তবে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এ বছর বড় ধরনের ডেঙ্গু সংকট এড়ানো সম্ভব।’
এ বিষয়ে বরগুনা পৌর প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল জাগো নিউজকে বলেন, আইইডিসিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী এরই মধ্যে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি এবার নেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নেই মশক নিধনের জন্য ফগার মেশিন রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে সমন্বিতভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এফএ/জেআইএম








