মাউন্ট এভারেস্ট-হিমালয় পর্বতমালা তথা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। উচ্চতা ২৯ হাজার ৩২ ফুট। শত বছরের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তের দুঃসাহসী অভিযাত্রীর দল সর্বোচ্চ এ শিখরের অহম জয় করতে চেয়েছে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারি ও নেপালের তেনজিং নোরগের বদৌলতে গোটা মানবজাতিই জয় করে ‘অজেয়’এই শৃঙ্গ। কিন্তু এত সহজেই কি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে পেরেছে মানুষ? প্রতি পদে যেখানে মৃত্যুর হাতছানি। দুর্গম পার্বত্য পথে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশি নারী হিসাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন নুরুন্নাহার নিম্নি। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় নারী হিসাবে এভারেস্ট জয় করলেন তিনি। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসাবে ২০১২ সালের ১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন নিশাত মজুমদার। একই বছরের ২৬ মে শিখর জয় করেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশি নারী হিসাবে এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেন নুরুন্নাহার নিম্নি। গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালে যান নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে তিনি পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। সেখানে ধাপে ধাপে উচ্চতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। পর্বতারোহণের উপযুক্ত সময় সাধারণত মে মাসের ১৫ থেকে ৩০ তারিখ ধরা হয়। সেই অনুযায়ী ১৭ মে তিনি চূড়ান্ত আরোহণের জন্য বেজক্যাম্প ছাড়েন। ২৩ মে তিনি ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছে শিখরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু সেদিন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকে আবার নিচে নেমে আসতে হয়। এরপর কয়েক দিন তিনি ক্যাম্প-২-এ অপেক্ষা করেন আবহাওয়ার উন্নতির জন্য। অবশেষে ২৫ মে আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবার যাত্রা শুরু করেন। ২৬ মে তিনি পুনরায় ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান এবং সেখান থেকেই রাতের দিকে চূড়ান্ত শিখর অভিযানে যাত্রা শুরু করেন। এরপর ২৭ মে ভোরে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। এ অভিযানে তার সঙ্গে নেপালের এইটকে এক্সপেডিশনের একজন শেরপা ছিলেন। পেশায় পূবালী ব্যাংক পিএলসির প্রিন্সিপাল অফিসার নিম্মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন। পাহাড়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই পর্বতারোহণে তার যাত্রা শুরু। তার এভারেস্ট অভিযানের স্পনসরও ছিল এ প্রতিষ্ঠান। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ফিল্ডওয়ার্কের সময় পাহাড়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। এরপর দীর্ঘসময় তিনি বান্দরবানের পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান। চাকরি জীবনে প্রবেশের পরও পাহাড়ের প্রতি তার আগ্রহ বজায় থাকে। তিনি ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রেকিং করেন। ২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্প পরিদর্শনের পর তিনি আরও উচ্চ শিখরে ওঠার স্বপ্ন দেখেন। এরপর ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক সম্পন্ন করেন। ২০২২ সালে তিনি ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন। একই বছর বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ সংগঠনের ব্যানারেই এবারের এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেন।

বাংলাদেশের হয়ে প্রথম এভারেস্টজয়ী হলেন মুসা ইব্রাহীম, যিনি ২০১০ সালের ২৩ মে শিখরে ওঠেন। এরপর ২০১১ ও ২০১২ সালে দুবার এভারেস্ট জয় করেন এম এ মুহিত। ২০১২ সালে এভারেস্ট জয় করেন নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন। ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্টজয়ী পঞ্চম বাংলাদেশি সজল খালেদ শিখর থেকে নামার পথে মারা যান। এরপর দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০২৪ সালে এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান বাবর আলী। ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় ওঠেন ইকরামুল হাসান শাকিল। এবার বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অভিযাত্রী হিসাবে এভারেস্ট জয় করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।