বিশ্বকাপে এমন কিছু দল আসে, যাদের দেখে মনে হয় তারা শুধু ম্যাচ জিতছে না, প্রতিপক্ষের বিশ্বাসটাও ভেঙে দিচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স এখন ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে।
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়টাকে শুধু একটি ফল বলা অন্যায় হবে। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফরাসিরা এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যে, কোনো এক মুহূর্তেও মনে হয়নি ম্যাচটি তাদের হাতছাড়া হতে পারে। এমনকি মরক্কো গোল করবে, এই সম্ভাবনাই তো তৈরি হয়নি।
এ কারণেই ফুটবল অঙ্গনে নতুন এক চর্চার জন্ম নিয়েছে। এখন প্রশ্নটা আর এই নে যে- ফ্রান্স কি বিশ্বকাপ জিতবে? প্রশ্নটা উলটে হয়ে গেছে, এই ফ্রান্সকে আসলে হারাবে কে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বিতর্ক আরও জমে উঠেছে। কেউ বলছেন, এই দলকে হারাতে হলে ১৯৭০ সালের ব্রাজিল অথবা ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এসব তো কেবলই কিছু কাল্পনিক আলোচনা। বাস্তবতা বলছে, এখন পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের দলকে সত্যিকার অর্থে চাপে ফেলতে পারেনি কেউ।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটিই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণের গতি, পজিশনিং, সবকিছুতেই ছিল ফ্রান্সের আধিপত্য। ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটেই দুবার গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায় তারা। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু দুর্দান্ত দুটি সেভ না করলে ম্যাচের চিত্র আরও আগেই বদলে যেতে পারত।
সেই শুরুটাই যেন এরপর গোটা ম্যাচের গল্প হয়ে ছিল। এরপর একের পর এক আক্রমণে মরক্কোকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে ফরাসিরা। মাঝমাঠে মাইকেল ওলিসে ও আদ্রিয়াঁ রাবিও ছন্দ তৈরি করছিলেন, সামনে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও দেজিরে দুয়ে বারবার রক্ষণভাগে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
আক্রমণের চাপ এতটাই ছিল যে, প্রায় পুরো দল নিয়েই রক্ষণ সামলাতে হচ্ছিল মরক্কোকে। একপর্যায়ে এমবাপেকে ডি-বক্সের ভেতরে ফাউল করে বসেন নুসাইর মাজরাউয়ি। পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারলেও এমবাপের ব্যর্থতায় ফরাসি শিবিরে খুব বেশি উদ্বেগ দেখা যায়নি। কারণ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি তাদের হাতেই।
দ্বিতীয়ার্ধে সেই আধিপত্য স্কোরলাইনেও প্রতিফলিত হয়। ৬০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিজের চেনা স্টাইলে দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন এমবাপ্পে। মাত্র ছয় মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কোর আর ম্যাচে ফেরার বাস্তব কোনো সুযোগই ছিল না। প্রথমার্ধেই ফ্রান্স গোলের উদ্দেশ্যে শট নেয় ১৩টি, বিপরীতে মরক্কো মাত্র একটি। অর্থাৎ প্রথম ৪৫ মিনিটে শটের ব্যবধান ছিল ১২।
১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এই ধরনের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথমার্ধে এর চেয়ে বড় ব্যবধান দেখা গেছে মাত্র একবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল নিয়েছিল ১৭টি শট, আর সুইডেন মাত্র একটি। পরে সেই বিশ্বকাপের ট্রফিও জিতেছিল ব্রাজিল।
এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আরেকটি দিক প্রতিপক্ষের জন্য আরও বেশি চিন্তার। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে একবারও পিছিয়ে পড়েনি দেশমের দল। ফলে এখনো জানা হয়নি, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই দল কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। তবে এটাও সত্য, ফ্রান্স যখন আগে গোল করে, তখনই তারা সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ সমতায় ফিরতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে রক্ষণ ছেড়ে ওপরে উঠতেই হয়। আর সেই ফাঁকা জায়গাগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে কাজে লাগাতে এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা দুয়ের মতো গতিময় ফুটবলারদের জুড়ি নেই।
অবশ্য সামনে পথ আরও কঠিন। স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আক্রমণভাগ ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ফ্রান্সকে আগের যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি পরীক্ষায় ফেলতে পারে। নকআউটের ফুটবলে একটি মুহূর্ত, একটি ভুল কিংবা একটি অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরম্যান্স পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে—বিশ্বকাপের ইতিহাস সেই প্রমাণে ভরা।
তবু এসব যুক্তির পরও বলতে হয়, এই মুহূর্তে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। উত্তর আমেরিকার মাটিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পরিপূর্ণ, সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী দলটির নাম ফ্রান্স। তাদের থামানোর স্বপ্ন অনেকেই দেখছে, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো ফুটবল এখনো কেউ দেখাতে পারেনি।








