ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা এই প্রার্থী পেয়েছেন ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে উপনির্বাচনের এই ফলাফল ঘোষণা করেন।

তবে দু–একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দিনভর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, দিনের প্রথম ভাগে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল বেশি। এ ছাড়া প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।

এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গত ২২ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে ১০ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।

নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি। আজ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ফাড়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে

নারী ভোটারের দীর্ঘ সারি
সদর উপজেলার দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ১০টার দিকে ভোট দিতে আসেন গৃহবধূ জবা রানী (৩২)। তখন নারী ভোটারের সারি কেন্দ্রের ফটক পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সারি এঁকেবেঁকে এগোচ্ছিল, অথচ পুরুষদের লাইনে ভোটার ছিল তুলনামূলক কম।

সেখানে অপেক্ষমাণ তাহমিনা বেগম (৫৩) বলেন, ‘সকালে ঘুম থাকি উঠিয়া ভোট দিবা চলে আইচ্ছু। এইঠে আসিয়া দেখু, মোর আগতে ভেল্লা লোক চলে আইচ্ছে। দেড় ঘণ্টা ধরি দাঁড়ায় আছু, অ্যালাও ভোট দিবা পারুনাই।’

দক্ষিণ বঠিনা ছাড়াও ফাড়াবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়, হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, রুহিয়ার খড়িবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভুল্লীর কেসুরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১৮টি কেন্দ্র ঘুরে নারী ভোটারের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ভোটারের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ফাড়াবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৮১৭ জন। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সাতটি বুথে ভোট পড়েছিল ৯৪২টি।

কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা অজয় কুমার সিংহ বলেন, ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ নারী। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, এলাকার নারীরা সকালে ভোট দিয়ে বাড়ির কাজে চলে যান। আর পুরুষেরা খেতখামারের কাজ শেষ করে দুপুরের পর ভোট দিতে আসেন।

ভােট গণনা। আজ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ফাড়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে

প্রথম ভোটের আনন্দ তরুণদের চোখেমুখে
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশের মহল্লার বাসিন্দা মোছা. মাছুমা এবারই প্রথম ভোটার হয়েছেন। জীবনের প্রথম ভোট দিতে এসে ভুল করে অন্য বুথে ঢুকে পড়েন তিনি। ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা তাঁকে ফিরিয়ে দিলে হতাশ হয়ে পড়েন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে নির্ধারিত বুথে পাঠান। কয়েক মিনিট পর ভোট দিয়ে বেরিয়ে আসেন মাছুমা। এবার তাঁর চোখেমুখে আনন্দ। তিনি বলেন, ‘প্রথম ভোট দিতে এসে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। এখন ভালো লাগছে। জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা।’

মাছুমার মতো এমন অন্তত ৩০ জন নতুন ও তরুণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মধ্যে প্রথমবার ভোট দেওয়ার আনন্দ ও প্রত্যাশার কথা জানা গেছে।

সদর উপজেলার চৌরঙ্গী বাজার এলাকার বাসিন্দা সাথী রায় (২০) বলেন, ‘জীবনে প্রথম ভোট দিলাম। এখন বলতে পারব, এমপি নির্বাচনে আমিও ছিলাম। একটা ভোট পাওয়ার জন্য প্রার্থীদের অনুনয়-বিনয় বেশ উপভোগ করেছি। আশা করছি, তাঁদের এই বিনয়ী ভাব ভোটের পরেও থাকবে।’


সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, উপনির্বাচনে তরুণ ভোটারের উপস্থিতি ও আগ্রহ লক্ষণীয়। তরুণদের এই আগ্রহ ধরে রাখতে হলে তাঁদের প্রত্যাশা পূরণে জনপ্রতিনিধিদের মনোযোগী হতে হবে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনায় আটক ও জরিমানা

ভোটের পরিবেশ মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুপুরে সদর উপজেলার দানারহাট আনছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে জাল ভোট দিতে আসার অভিযোগে তিন তরুণকে আটক করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের সবাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, ওই তিন তরুণ পুরুষ ভোটারের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় অন্য ভোটাররা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আটক করা হয়।

অন্যদিকে সদরের জগন্নাথপুর এলাকার আইডিয়াল উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে ছবি ও ভোটার নম্বরসংবলিত লিফলেট পাওয়ার অভিযোগে আবদুল করিম নামের এক ব্যক্তিকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন বিচারক সাদিয়া আফসানা রিমা। আবদুল করিম কেন্দ্রের বাইরে ভোটার তথ্য সহায়তা বুথের দায়িত্বে ছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্টেনোগ্রাফার ও সহায়ক কর্মচারী আরিফুজ্জামান জানান, আবদুল করিম জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ট।

ডাব প্রতীকের এজেন্ট নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনে ডাব প্রতীকের প্রার্থী হুসেইন মোহাম্মদ ওমর ফারুকের পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির প্রার্থী ফয়সল আমীনের অভিযোগ, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ডাব প্রতীকের প্রার্থী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করেছেন। ওই এজেন্টরা মূলত দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করেছেন বলে তাঁর দাবি।

সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০টি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সব কটি কেন্দ্রের বুথে ডাব প্রতীকের পোলিং এজেন্ট রয়েছেন। অথচ নির্বাচনী প্রচারে ওই প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুন তেমন চোখে পড়েনি, মাইকেও প্রচার শোনা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রুইয়া উপজেলার ঝলঝলি পুকুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভোটার বলেন, ‘আজকে ভোট দিতে এসে দেখলাম ডাব মার্কার পোলিং এজেন্ট। আমি হতবাক হয়েছি। এত লোক কোথা থেকে?’

ডাব প্রতীকের ১৮ জন পোলিং এজেন্টের সঙ্গে কথা বলেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক। তাঁদের মধ্যে আটজন প্রার্থীর নাম বলতে পারেননি, ছয়জন ভুল নাম বলেছেন। বাকি চারজন প্রার্থীর নাম সঠিকভাবে বলতে পারলেও কীভাবে বা কার মাধ্যমে এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।

সদরের ফাড়াবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ডাব প্রতীকের পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাথী আক্তার। তিনি দাঁড়িপাল্লার এজেন্ট কি না, জানতে চাইলে বলেন, ‘হামার চালাকিখান বুঝে গেইছেন?’

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, ভোট শেষে স্বস্তি
ভোট গ্রহণের শুরু থেকে গণনা পর্যন্ত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলেছে। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, ধানের শীষের প্রার্থী ফয়সল আমীনের কর্মী-সমর্থকেরা ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটারদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভোট টানার চেষ্টা এবং জাল ভোট দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জাতীয় ইস্যু তৈরির উদ্দেশ্যে এসব অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের চেষ্টা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায় ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। এবার উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন। ফলে আসনটিতে ভোটের আগে থেকেই সবার নজরের পাশাপাশি উত্তেজনা ছিল।

তবে ভোট গ্রহণ শেষে ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি দেখা যায়। বড়মাঠ-সংলগ্ন এলাকার ভোটার মাঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ভোটে অনেক ঝামেলা হবে। কিন্তু কোনো গোলমাল বা দুর্ঘটনা ঘটেনি। ভালোভাবেই ভোট শেষ হয়েছে।’

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে আমরা বদ্ধপরিকর ছিলাম। বিভিন্ন পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে তৎপর ছিলেন। চার বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ ১৭৭ জন দেশি ও স্থানীয় পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ করার মতো কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’