পাবনা সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিবরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একের পর এক দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসের ব্যবধানে অন্তত চারবার বিদ্যালয়টিতে চুরি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার মেলেনি। এতে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে ধারাবাহিক চুরির প্রতিবাদ ও সুবিচারের দাবিতে বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ সোমবার (২০ জুলাই) বিকেল সাড়ে চারটায় বিদ্যালয় বন্ধ করে শিক্ষকরা বাড়ি চলে যান। পরদিন ২১ জুলাই সকাল আটটায় বিদ্যালয়ে এসে দেখা যায়, অজ্ঞাতনামা চোরচক্র শ্রেণিকক্ষ ও কার্যালয়ে প্রবেশ করে ব্যাপক চুরি সংঘটিত করেছে। চোরেরা বিদ্যালয়ের ৭টি জানালার লোহার গ্রিল ও শাটার, ২০টি সিলিং ফ্যান, পানির ট্যাংকির স্টপ কল, পানির পাইপ, দরজার হ্যাজবলসহ ৯টি তালা, ১টি স্টিলের গেট, ৪টি ছোট পানির ট্যাংকি, ইন্টারনেটের রাউটার ও তারসহ লক্ষাধিক টাকার মূল্যবান সরকারি মালামাল নিয়ে যায়। এ নিয়ে চলতি বছরে চারবার চুরির ঘটনায় প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্থানীয় মাদকাসক্ত ও সংঘবদ্ধ চোরচক্রের ধারাবাহিক চুরির ঘটনা। এর আগে চলতি বছরের গত ২৩ জুন এবং ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও দুবার এই বিদ্যালয়ে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিবারই পাবনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অফিসকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তবে অভিযোগ দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ফলে বাধ্য হয়ে ধারাবাহিক চুরির প্রতিবাদ ও সুবিচারের দাবিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী নিয়োগ, চুরি হওয়া সরকারি মালামাল উদ্ধার এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুকাইয়া আক্তার রুকু ও রাসেল বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ফ্যানগুলো চুরি হয়েছে, গরমে বাচ্চারা কীভাবে ক্লাস করব? দরজা জানালার বিভিন্ন অংশ খুলে নেওয়ায় বৃষ্টির পানি ক্লাসরুমে ঢুকছে। এসব নিয়ে শিক্ষকরাও চিন্তিত। আমরা ঠিকভাবে ক্লাস করতে পারছি না।’
শিক্ষক সুলতানা ইয়াসমিন শেলী ও সাইদ হোসেন বলেন, ‘এগুলো স্থানীয় মাদকাসক্তরা ধারাবাহিকভাবে করছে। বার বার এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নেই। স্থানীয়রাও কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। এভাবে একটি প্রতিষ্ঠান চলে না।’
এ বিষয়ে শিবরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. শামীম হোসেন জানান, ঘন ঘন চুরির কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছি না।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার প্রতিকার ও বিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে পাবনা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। স্মারকলিপির মাধ্যমে দ্রুত চুরির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, নৈশপ্রহরী নিয়োগ, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পুলিশ টহল বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সরকারি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বের ঘটনাগুলোতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা নয়। যদিও চোর শনাক্তকরণ ও মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এবারের ঘটনাটি পুলিশ আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। চোর শনাক্ত ও মালামাল উদ্ধারের কাজ চলমান।’

পাবনা সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা শবনম বলেন, ‘শিক্ষকদের সঙ্গে আমরাও দিশেহারা। বার বার থানা ও উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি নিয়ে অবহিত করেও কোনো ফলাফল মেলেনি।’
নিরাপত্তা বা নৈশপ্রহরী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই পর্যায় থেকে এ ধরনের নিয়োগের সুযোগ নেই। এগুলো অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের হাতে। এর আগে একাধিকবার তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখনো অনুমোদন মেলেনি।’
এ ব্যাপারে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী নিয়োগ ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন সহ নিরাপত্তা নিশ্চিতে অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হবে। দ্রুতই যেন এটি বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখা হবে।
আলমগীর হোসাইন নাবিল/কেজে/জেআইএম








