যান্ত্রিক কোলাহল নেই, নেই ব্যস্ততার ছুটে চলা। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ আর নীরব প্রকৃতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম রাজারামকুড়া। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার এই গ্রামে বর্তমানে বসবাস করেন মাত্র ১২ জন মানুষ। শিশু থেকে বৃদ্ধ—দুটি পরিবারের এই এক ডজন বাসিন্দাকে নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামটিকে জেলার সবচেয়ে ছোট গ্রামগুলোর একটি বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সীমান্তবর্তী রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের একটি রাজারামকুড়া। প্রায় ২৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ইউনিয়নটিতে জনসংখ্যা ১৯ হাজার ৪৪১। অথচ ১০৭ একর আয়তনের রাজারামকুড়া গ্রামে রয়েছে মাত্র দুটি পরিবার।

আধুনিক ব্যস্ত জীবনের প্রেক্ষাপটে মাত্র ১২ মানুষের একটি গ্রাম নিঃসন্দেহে বিস্ময় জাগায়। তবে রাজারামকুড়ার নীরবতা, বিস্তীর্ণ সবুজ আর হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের স্মৃতি জানিয়ে দেয়, সময় বদলালেও কিছু জনপদ এখনো অতীতের ছাপ বহন করে চলেছে।

গ্রামটিতে রয়েছে রাজারামকুড়া নামে একটি খাল ও একটি সড়ক। নামকরণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা না গেলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাজারামকুড়া খালের নাম থেকেই গ্রামের নামকরণ হয়েছে। এখানে সরকারি সামাজিক বনায়নের একটি বাগানও রয়েছে।

গ্রামের পূর্ব পাশে বসবাস করেন গ্রাম পুলিশ নুর ইসলাম। পশ্চিম পাশে কৃষক আব্দুল লতিফের পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে এই দুটি পরিবারের সদস্যরাই রাজারামকুড়ার একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁদের বাড়ির চারপাশজুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। দিনের বেশির ভাগ সময় গ্রামজুড়ে নেমে থাকে নিস্তব্ধতা।

গ্রাম পুলিশ নুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এখন মানুষ বলতে দুটি পরিবার। একসময় এখানে আরও মানুষ বসবাস করতেন। সময়ের সঙ্গে অনেকে অন্যত্র চলে গেছেন। গ্রামের পরিবেশ শান্ত হলেও যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা খুব একটা ভালো নয়।’

কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘এই গ্রামেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। আগে চারপাশে অনেক বন-জঙ্গল ছিল। এখন সেসব নেই। কৃষিকাজই আমাদের প্রধান জীবিকা। রাস্তা ও খালটি সংস্কার করা হলে চলাচল ও কৃষিকাজে অনেক সুবিধা হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় রাজারামকুড়া ছিল ঘন বন-জঙ্গলে ঘেরা একটি এলাকা। সেখানে হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল। বন উজাড়, জনবসতির বিস্তার ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামের চেহারা। হারিয়ে গেছে গহিন অরণ্য, কমেছে বন্য প্রাণীর আনাগোনা। একসময় যেখানে হরিণের বিচরণ ছিল, এখন সেখানে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ ও জনশূন্য ভিটেমাটি।

পার্শ্ববর্তী মায়াঘাসি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, ‘রাজারামকুড়া অনেক পুরোনো গ্রাম। আগে এই এলাকা জঙ্গলে ভরা ছিল বলে শুনেছি। এখন সেখানে মানুষও কম, আবার উন্নয়নও তেমন হয়নি। রাস্তা ও খালটি সংস্কার করা হলে দুই গ্রামের মানুষেরই উপকার হবে।’

প্রকৃতির রূপ বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া তেমন না লাগায় রাজারামকুড়া যেন কয়েক দশক আগের সময়েই আটকে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, খালের সংস্কার ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হলে গ্রামটির জীবনমান বদলে যেতে পারে।

রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, দুটি পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠা রাজারামকুড়া ইউনিয়নের সবচেয়ে ছোট গ্রামগুলোর একটি। গ্রামটি কিছুটা অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সেখানে প্রয়োজনীয় কাজ করার চেষ্টা করা হবে।