চিরায়ত মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। যে গল্পে ছিল একমাত্র ছেলেকে ঘিরে মা-বাবার স্বপ্ন, অসংখ্য আশা। পাশাপাশি একটি স্বাভাবিক সংসারের প্রতিদিনের লড়াই। সেই সংসারে এক সন্ধ্যায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ব্যক্তি নয়, যেন লেখা হয় একটি সাজানো সংসারের মৃত্যু পরোয়ানা।

যে মায়ের হাত ধরে বড় হয়েছেন, যার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছেন, সেই মাকেই নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে একমাত্র ছেলের বিরুদ্ধে।

এটাও সম্ভব! সামনে আসে নানান প্রশ্ন। তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রথমে চার মাস ধরে তদন্ত করে রূপনগর থানা পুলিশ। আদালতে জমা দেয় অভিযোগপত্র। কিন্তু বাগড়া দেন নিহত নারীর স্বামী মো. মনিরুজ্জামান দিপু। তিনিই মামলার বাদী। সেই তদন্তকে ‘মনগড়া’ আখ্যা দিয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেন তিনি।

রাজধানীর রূপনগরের এই ব্যবসায়ীর বিশ্বাস, ঘটনার সব সত্য উঠে আসেনি। এরপর আদালতের নির্দেশে মামলাটি অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। টানা চার মাস ছয়দিনের পুনঃতদন্ত শেষে পিবিআইও শেষ পর্যন্ত পূর্ববর্তী তদন্তের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অভিযোগপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আরও পড়ুন

লুট-ধর্ষণ-সীমাহীন বর্বরতা: ভাইকিংদের যে অন্ধকার ইতিহাস জানে না অনেকেই

এর মধ্যেই ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। তদন্তের মধ্যেই মামলার একমাত্র আসামি মাকে হত্যা করা রেজোয়ান আহম্মেদ কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা যান। ফলে আইনগত কারণেই তাকে অভিযোগপত্রে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

পরিবারের সব স্বপ্ন, সব প্রত্যাশা ছিল ২৫ বছর বয়সী রেজোয়ানকে ঘিরেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিইউবিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (সিএসই) পড়াশোনা শেষ করেন রেজোয়ান। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিক্ষানবিশ হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশের। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় এ তরুণের জীবনে হঠাৎ নেমে আসে অন্ধকার। শুধু রেজোয়ান নন, গোটা সংসারই যেন ডুবে যায় অমাবস্যার অন্ধকারে।

কেন একজন উচ্চশিক্ষিত সন্তান তার মাকে নির্মমভাবে হত্যা করবে? ঘটনার নেপথ্যে কী? রেজোয়ানের বাবাই বা কেন নারাজি দিলেন, পুনঃতদন্তের প্রয়োজন পড়লো?

তদন্তে উঠে এসেছে, বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্বের মধ্যে বড় হওয়া রেজোয়ান একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। নেশার জন্য প্রায়ই মায়ের কাছে টাকা চাইতেন। টাকা না পেলে বাবা-মায়ের অজান্তে ঘর থেকে চুরি করতেন টাকা।

আরও পড়ুন

৪২ হাজার বোতলে দাঁড়িয়ে আছে পুরো বাড়ি

সন্তানকে এই আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনতে বাবা-মা চেষ্টা করেছিলেন, টাকা-পয়সা তার নাগালের বাইরে রাখতেন। কিন্তু সেই চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত পরিবারটি রক্ষা করতে পারেনি।

যে মা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, তদন্তের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত সেই মায়ের জীবনই কেড়ে নেয় তার একমাত্র সন্তান। এক রাতেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন, ভালোবাসা ও অস্তিত্ব।

ঘটনার শুরু

মামলার বাদী মো. মনিরুজ্জামান দিপু একজন ব্যবসায়ী। তার স্ত্রী রাশিদা খাতুন (৪৯) মিল্ক ভিটা সমবায় সমিতির সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের একমাত্র সন্তান রেজোয়ান আহম্মেদ।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত বছরের ২৮ মে সকালে রাশিদা খাতুন প্রতিদিনের মতো অফিসে যান। দুপুরে ব্যবসার কাজে বাইরে যান তার স্বামী মনিরুজ্জামান দিপু। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসায় ফিরে মনিরুজ্জামান দেখতে পান দরজা অল্প একটু খোলা। ভেতরে ঢুকে ড্রইংরুম ও বাথরুমের সামনে দেখতে পান রক্তের দাগ। শয়নকক্ষে ঢুকে দেখেন স্ত্রীর রক্তাক্ত মরদেহ।

পাশের কক্ষে ছেলে রেজোয়ানের দরজা ছিল বন্ধ। ডাকাডাকির পর সে দরজা খুলে দেয়। মায়ের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করলে প্রথমে বিভ্রান্তিকর উত্তর দিলেও পরে স্বীকার করে, সন্ধ্যায় সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রান্নাঘর থেকে বঁটি এনে মায়ের ওপর ১৬টি কোপ দেয়। পরে গোসল করে নিজের কক্ষে অবস্থান করে।

প্রথমে থানা পুলিশের তদন্ত

মামলাটির তদন্ত করেন রূপনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শাহেদ হোসেন। তিনি ঘটনাস্থল থেকে আলামত জব্দ করেন এবং রেজোয়ানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠান।

আরও পড়ুন

মৃত্যু থামাতে পারেনি কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. সুব্রত হাওলাদারের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট গুরুতর জখমজনিত শকে রাশিদা খাতুনের মৃত্যু হয়েছে এবং এটি হত্যাকাণ্ড।

তদন্ত শেষে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে থানা পুলিশ।

বাদীর নারাজি

থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শাহেদ হোসেনের তদন্তের বিরুদ্ধে মামলার বাদী রেজোয়ানের বাবা মনিরুজ্জামান দিপু আদালতে নারাজির আবেদন করেন।

তিনি আদালতে হাজির হয়ে বলেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না করে ‘মনগড়া’ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য প্রার্থনা করছি।” বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

পিবিআইয়ের ৪ মাস ৬ দিনের তদন্ত

চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মো. আজিজুল হক। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার পূর্ণ ডকেট সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেন। ঘটনাস্থল পুনরায় পরিদর্শন, পূর্ববর্তী ১৩ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ, আলামত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্ত সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে নতুন কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি।

রেজোয়ানের ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ জবানবন্দি

পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার একমাত্র আসামি রেজোয়ান আহম্মেদ জবানবন্দিতে বলেন, বাবা ও মায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। মা অফিস থেকে বিকেল ৫টার দিকে বাসায় ফেরে। আমি তখন শুয়ে ছিলাম। মা আমাকে বকাবকি শুরু করলে আমাকে একপর্যায়ে আত্মহত্যা করতে বলেন। এতে রাগান্বিত হয়ে রান্নাঘর থেকে বঁটি দিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাকে অনেকগুলো আঘাত করি। তারপর আমি বাথরুমে গোসল করে রুমের দরজা আটকিয়ে ভেতরে ছিলাম।

পিবিআইয়ের তদন্তে মাদকাসক্তির তথ্য

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, আসামি রেজোয়ান মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য মা-বাবার টাকা চুরি করে নেশা করতেন। নেশা করার বিষয়টি মা-বাবা জানতে পেরে তাকে মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য টাকা-পয়সা সাবধানে রাখতেন।

আরও পড়ুন

ডার্ক ওয়েব-ক্রিপ্টোতে বাড়ছে মাদক কারবার, ঠেকাতে আসছে ‘সাইবার ফরেনসিক’

ঘটনার দিন গত বছরের ২৮ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রেজোয়ানের মা অফিস থেকে বেতন ও বোনাস উঠিয়ে বাসায় আসেন। এরপর রেজোয়ান তার মায়ের বেতন ও বোনাস নিয়ে ঝগড়া করেন যাতে কিছুটা টাকা তার মা দেন। নেশা করবে বলে মা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ঝগড়ার এক পর্যায়ে রান্নাঘর থেকে বঁটি নিয়ে এসে তার মাকে উপর্যুপুরি কোপ মারেন।

তদন্ত চলাকালেই আসামির মৃত্যু

পিবিআই জানায়, তদন্ত চলাকালে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ আটক অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রেজোয়ান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বিকেল ৩টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয় ‘মৃত অবস্থায় আনা হয়’।

তদন্ত কর্মকর্তার মতামত

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, পিবিআই তদন্তে নতুন কোনো আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. আজিজুল হক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, বিশেষজ্ঞের মতামত ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পর্যালোচনায় পূর্ববর্তী তদন্তের মূল সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতি পাওয়া গেছে। তবে যেহেতু মামলার একমাত্র এজাহারভুক্ত ও অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি তদন্ত চলাকালেই মারা গেছেন, তাই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় আইনগতভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।

এ অবস্থায় মামলাটি দীর্ঘায়িত করার যৌক্তিকতা নেই বলে মত দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে পূর্ববর্তী অভিযোগপত্রের ধারাবাহিকতায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আসামির মৃত্যুর কারণে তাকে অভিযোগপত্রে আইনগত অব্যাহতির আবেদন করার সুপারিশ করা হয়। বাদীকেও জানানো হয় তদন্তের ফলাফল।

টিটি/এএসএ/এমএফএ