বাজার থেকে কেনাকাটা করে বের হওয়ার সময় হাতে ধরা একটি সাধারণ কাগজের ব্যাগ। দেখতে খুবই সাধারণ, দামও কম। কিন্তু এই ছোট্ট ব্যাগটি হতে পারে পরিবেশ রক্ষার একটি বড় পদক্ষেপ। প্রতিবার প্লাস্টিকের বদলে একটি কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যাগের পরিবর্তন নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার একটি প্রতীক।
প্রতি বছর ১২ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব পেপার ব্যাগ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাগের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে কাগজের ব্যাগ ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা।
আরও পড়ুন
বিশ্ব পেপার ব্যাগ দিবস / ফেলে দেবেন না, নতুনভাবে ব্যবহার করুন
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দিবস?
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, যার বড় অংশই কয়েক মিনিট ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। অথচ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ সম্পূর্ণভাবে পচে যেতে শত শত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ সময়ে এটি মাটি, নদী, সমুদ্র ও বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে।
বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিক দূষণ একটি বড় পরিবেশগত সমস্যা। ড্রেন ও খাল-নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি থেকে শুরু করে নদী ও সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাগজের ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি।
একটি কাগজের ব্যাগ কীভাবে বদলে দিতে পারে অনেক কিছু?
একটি কাগজের ব্যাগ হয়তো পৃথিবীকে একদিনেই বদলে দেবে না। কিন্তু কোটি মানুষের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মিলেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। কাগজের ব্যাগ ব্যবহারের কয়েকটি ইতিবাচক দিক-
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক কাদা দিবস / মাটির গন্ধে ফিরে আসুক হারানো শৈশব
- প্লাস্টিকের তুলনায় সহজে পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) করা যায়।
- অনেক ক্ষেত্রে জৈবভাবে পচে (বায়োডিগ্রেডেবল) পরিবেশে মিশে যায়।
- বন্যপ্রাণী ও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর।
- পরিবেশবান্ধব ব্যবসা ও টেকসই ভোগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
- সচেতন ভোক্তা হিসেবে ইতিবাচক বার্তা দেয়।
তবে কাগজের ব্যাগই কি একমাত্র সমাধান?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। কারণ কাগজ তৈরিতেও পানি, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন হয়।
সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘কম ব্যবহার করুন, বারবার ব্যবহার করুন এবং পুনর্ব্যবহার করুন’ -এই নীতি অনুসরণ করা।
আরও পড়ুন
জাতীয় ক্যামেরা দিবস / ছবির ফ্রেমে বন্দি স্মৃতি আর সময়ের গল্প
অর্থাৎ, সম্ভব হলে কাপড়ের ব্যাগ বা দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ সঙ্গে রাখা আরও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত হতে পারে। আর যদি কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটিও যতবার সম্ভব পুনরায় ব্যবহার করা উচিত।
বাংলাদেশে বদলাচ্ছে চিত্র
পরিবেশ দূষণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, বইয়ের দোকান, পোশাকের ব্র্যান্ড এবং ছোট ব্যবসায়ীরাও ধীরে ধীরে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্র্যান্ডিংয়েও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তারা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ, জুট ও কাপড়ের ব্যাগ তৈরি করে নতুন ব্যবসার সুযোগও তৈরি করছেন। ফলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়া ডে: ব্যবহার করছেন, নাকি ব্যবহৃত হচ্ছেন?
আমরা কী করতে পারি?
পরিবেশ রক্ষায় বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা না করে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসেই কিছু পরিবর্তন আনা যায়।
- কেনাকাটায় নিজের ব্যাগ সঙ্গে রাখুন।
- অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যাগ নেওয়া এড়িয়ে চলুন।
- কাগজের ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে না দিয়ে পুনরায় ব্যবহার করুন।
- শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলুন।
- পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করুন।
ছোট সিদ্ধান্ত, বড় পরিবর্তন
পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য সব সময় বড় বড় প্রযুক্তি বা বিশাল প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় একটি ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। বাজারে যাওয়ার সময় একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা কাগজের ব্যাগ সঙ্গে নেওয়া তেমনই একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন
বীমা সম্পর্কে যেসব তথ্য অনেকেই জানেন না
বিশ্ব পেপার ব্যাগ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়-পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব। আজ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ কম ব্যবহার করলে হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য একটি পৃথিবী রেখে যেতে পারবো। কারণ, সত্যিই একটি কাগজের ব্যাগ, অসংখ্য সম্ভাবনা।
জেএস/








