• আশ্বাস-ঘোষণাতেই থমকে স্বপ্নের ট্রেন
  • যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না ১৭১৪ কোটি টাকার রেলপথ
  • আশা জাগাচ্ছে মন্ত্রীর ঘোষণা

ঈশ্বরদী-পাবনা রেলপথে ২০১৮ সালে ১৫ জুলাই ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন চলাচলের মধ্যদিয়ে এ রেল রুটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ঈশ্বরদী-পাবনা রেলপথ চালুর পর থেকে পাবনা-ঢাকা সরাসরি একটি যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনের দাবি জানিয়ে আসছে পাবনাবাসী। রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এমপি, সচিবদের বারবার আশ্বাসের পরও এ রেলপথে নতুন ট্রেন চালু হয়নি।

১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথে এখন শুধুমাত্র পাবনা-রাজশাহী রুটে ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চলাচল করে। ফলে এ রেলরুটে বিপুল অর্থ লোকসান গুনতে হয় সরকারকে।

আরও পড়ুন

রেলওয়ের মালামাল চুরি, বাড়ানো হচ্ছে গোয়েন্দা তৎপরতা

এর মধ্যেই বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালু হচ্ছে চলতি বছরের আগস্টে। গত ২০ জুন সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পাবনা সার্কিট হাউজে এ ঘোষণা দেন। মন্ত্রীর এ ঘোষণার পর নতুন করে আশায় বুক বাঁধে পাবনার মানুষ।

কিন্তু নতুন এ ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ও পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুন

চীনা ঋণেই হচ্ছে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ লাইন

তবে ঢাকা রেলভবনের এক কর্মকর্তা জানান, এ ট্রেন যেন দ্রুত চালু হতে পারে সেজন্য কাজ শুরু করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

একটি ট্রেনের জন্য আর কত অপেক্ষা?

পাবনার ঈশ্বরদী সম্মিলিত নাগরিক জোটের আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান পলাশ বলেন, পাবনা-ঢাকা রুটে ট্রেন চালু হলে ঈশ্বরদীসহ পুরো পাবনা জেলার মানুষের যোগাযোগের সুবিধা হবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভৌগোলিক কারণে এ অঞ্চল উন্নত। এ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ট্রেন ও ট্রেনের সিট সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাত্রীরা ট্রেনে ঢাকায় যেতে পারেন না। তাই এই ট্রেন চালু হলে যাত্রীদের চলাচলে অনেক সুবিধা হবে।

আরও পড়ুন

যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ: প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ পর্যায়ে

পাবনা সদর উপজেলার টেবুনিয়া ফলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ঈদ্রিস আলী জানান, পাবনা-ঢাকা ট্রেন চলাচল এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। এ ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। আশা করি মন্ত্রী মহোদয়ের আশ্বাস অনুযায়ী আগস্ট আসে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।

পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোশারেফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, পাবনা-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচলের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে (রাজশাহী) ডেপুটি চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট গৌতম কুমার কুন্ডু জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকা রেলভবন থেকে এখনো পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। ট্রেন চালুর বিষয়টি রেলভবন বলতে পারবে। তিনি রেল ভবনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

আরও পড়ুন

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ / নির্মাণের আগেই পরামর্শে ব্যয় ২৩১ কোটি টাকা

বাংলাদেশ রেলওয়ের (রেলভবন) ঢাকার অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম জানান, ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। একটি নতুন ট্রেন চালু করতে হলে ট্রেনের ইঞ্জিন, কোচ, স্টাফ, সময়সূচি নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। রেল কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ে কাজ করছে।

একটি ট্রেনের জন্য আর কত অপেক্ষা?

এর আগে ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম ও তৎকালীন সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব এহছানুল হক ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরিদর্শন করেন। তখনো সচিবদ্বয় এ রুটে দ্রুত নতুন ট্রেন চালুর আশ্বাস দেন।

এছাড়াও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পাবনা সফরে এসে পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা দেন। তিনি ২০২৩ সালের ১৬ মে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনায় ঘোষণা দেন শিগগিরই পাবনা-ঢাকা সরাসরি রেল যোগাযোগ শুরু হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও রেল বিভাগের ইঞ্জিন ও কোচ স্বল্পতার কারণে তৎকালীন সময়ে ট্রেন চালু হয়নি।

জানা যায়, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সরকার ঈশ্বরদী-পাবনা রেলপথ প্রকল্পের কাজ শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিল। সে অনুযায়ী ঈশ্বরদী থেকে পাবনা পর্যন্ত রেলপথের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। ৩৮ বছর প্রকল্পটি বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে এক জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রেলপথ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।

নির্মাণাধীন প্রকল্পের নকশা থেকে জানা যায়, নতুন এই রেলপথটি ঈশ্বরদীর মাঝগ্রাম স্টেশন থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত যাবে। রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১১টি রেলস্টেশন এবং ১০২টি ছোট ও ১১টি বড় সেতু নির্মাণের কথা রয়েছে। লেভেল ক্রসিং গেট থাকবে ৫০টি। এজন্য ১ হাজার ১৪ দশমিক ২১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

২০১৮ সালে ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১৫ জুন এই রুটে পাবনা জেলা সদর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামের একটি ট্রেন চালু হয়। পরে ২০২০ সালে জেলা সদর থেকে বেড়া উপজেলার ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইনের কাজ শেষ হলে পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢালারচর থেকে ছাড়তে শুরু করে। এসময় নতুন কোনো ট্রেন বৃদ্ধি না করে ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির নাম পরিবর্তন করে ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ করা হয়। বর্তমানে একটি ট্রেনই এই রুটে চলাচল করছে।

এফএ/জেআইএম