স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যকে আরো কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। এ পরিস্থিতিতে অন্যায্য আমদানির প্রভাব থেকে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)।

সম্প্রতি বিটিটিসির প্রস্তুত করা ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন রপ্তানি বাজারে বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধা হারাবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এ অবস্থায় শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি বা নতুন বাজার অনুসন্ধান যথেষ্ট হবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের আওতায় দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

বিটিটিসির মতে, বাণিজ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং বা সেফগার্ড শুল্ক আরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে কার্যকর আইন, দক্ষ তদন্ত ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার, বাজার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে অংশগ্রহণ এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির বিষয়ও জড়িত।

প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে কোনো দেশ পণ্য রপ্তানি করলে সেটিকে ডাম্পিং হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নেওয়া যায়। একইভাবে বিদেশি সরকার রপ্তানিকারকদের বিশেষ ভর্তুকি দিলে কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা এবং হঠাৎ আমদানি বেড়ে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেফগার্ড ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মেও এসব ব্যবস্থা বৈধ প্রতিকার হিসেবে স্বীকৃত।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকার, শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর, জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ট্রেড ডিফেন্স সাপোর্ট সেন্টার, তথ্য আদান-প্রদানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে গবেষণাভিত্তিক একাডেমিক কনসোর্টিয়াম প্রতিষ্ঠা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, পাটপণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য রপ্তানিও বাড়ছে। তবে, এসব শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে সময়োপযোগী বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা জরুরি।

এতে আরো বলা হয়, কার্যকর তদন্ত পরিচালনার জন্য নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি পণ্যের মূল্য, দেশীয় উৎপাদনের ক্ষতি, কর্মসংস্থান, বাজার হিস্যা ও আর্থিক ক্ষতির তথ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই থাকে। তাই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। 

তার মতে, বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনসহ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হবে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “এলডিসি-উত্তর সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি মেনেই দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এ লক্ষ্যে যেসব প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।”

বিটিটিসি আরো উল্লেখ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে বাণিজ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।