একটি দেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ যখন প্রায় পাঁচ দশকের ‘স্বল্পোন্নত’ পরিচয় ঘুচিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পা রাখতে যাচ্ছে, তখন এই অর্জন আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে—এই উত্তরণ কি আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন নতুন সংকটের দরজা খুলে দেবে?উত্তরণের দীর্ঘ পথপরিক্রমাজাতিসংঘ ১৯৭১ সালে এলডিসির তালিকা প্রণয়ন করে, এবং বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় যুক্ত হয়। মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতির সুবাদে বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার এবং ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দ্বিতীয়বার উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করে। মূল পরিকল্পনায় ২০২৪ সালে উত্তরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় বিবেচনায় নিয়ে সেই সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: প্রস্তুতিকাল কি আরও বাড়ছে?২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালেই উত্তরণ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে সরকার জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত ২ জুন ২০২৬ এই আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে, যার ফলে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সিডিপি স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বর্ধিত সময়ে বাংলাদেশকে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে— অর্থাৎ সময় বাড়লেও সংস্কারের দায়বদ্ধতা থেকে কোনো অবকাশ মিলছে না।উল্লেখ্য, সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছে—মাথাপিছু আয়ে নির্ধারিত মানদণ্ড ১,২৪২ মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন প্রায় ২,৭৯৩ ডলার; মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্টের মানদণ্ডের বিপরীতে অর্জন ৭৭ দশমিক ৩ পয়েন্ট; এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্টের সীমার নিচে থাকার শর্তে বাংলাদেশের অবস্থান ২৬ দশমিক ৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ, বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই; প্রশ্নটি কেবল সময়সীমা ও প্রস্তুতির পরিমিতি নিয়ে।প্রাপ্তি ও সম্ভাবনার দিকউত্তরণ একটি মর্যাদার প্রশ্নও। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই স্বীকৃতি ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি ঋণ নেয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাগুলো তখনই বাস্তব ফল দেবে, যখন আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল থাকতে পারবো; অন্যথায় সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়তি ঋণভারে রূপ নিতে পারে।ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলোএলডিসি মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বহু বাণিজ্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে উত্তরণের পর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার—দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৮ শতাংশ পণ্য ইইউতে যায়, এবং এলডিসি সুবিধার কারণে এর প্রায় ৯৩ শতাংশই বিনা শুল্কে প্রবেশ করে। গ্রাজুয়েশনের পর এই শুল্কমুক্ত সুবিধা ধাপে ধাপে কমে আসবে; রূপান্তরকালীন তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর শুল্কহার সাধারণ আমদানিকারক দেশগুলোর নীতি অনুযায়ী বাড়তে পারে। স্বস্তির খবর হলো, বিশ্লেষকদের মতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারগুলো উত্তরণের পরও প্রায় তিন বছর অতিরিক্ত অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বাড়তি সময়ও স্থায়ী সমাধান নয়—একদিন এই সুবিধাও শেষ হবে, এবং তখন রপ্তানি খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পকে দামভিত্তিক প্রতিযোগিতার বদলে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।এর বাইরেও কঠিন শর্তের বাণিজ্য আলোচনার চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে একটি শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এর বিনিময়ে নানা কঠিন শর্ত মেনে নিতে হয়েছে—যা ভবিষ্যতের বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি, এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত যে ছাড় (ট্রিপস ওয়েভার) এতদিন পাওয়া যেত, তা-ও সীমিত হয়ে আসবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্যে এবং সাধারণ মানুষের ওষুধ প্রাপ্তির সুযোগে।রাজস্ব খাতেও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। বর্তমানে জাতীয় রাজস্বের একটি বড় অংশ আমদানি শুল্ক থেকে আসে, এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই শুল্ক-নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুপারিশ এসেছে। এই নির্ভরতা কমানোর অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ কর আদায় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা—যা সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ভিত্তি এখনো প্রশস্ত না হওয়ায়। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও মূলধন পাচার রোধে সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি, কেননা দুর্বল অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা উত্তরণ-পরবর্তী ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।প্রস্তুতির রূপরেখা: স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিএই বাস্তবতা মাথায় রেখে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ প্রণয়ন করে, যেখানে পাঁচটি মূল স্তম্ভ—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্য সুবিধা ও রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা—এর অধীনে ৩০টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র ও ১৫৭টি সময়সীমাবদ্ধ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও এই এসটিএস কাঠামো বহাল রেখে উত্তরণ ইস্যুতে সক্রিয় হয়; নতুন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির শপথ নেওয়ার পরপরই জানান, উত্তরণের সময়সীমা পেছাতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে, এবং সরকার জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়—যুক্তি দেখানো হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও একের পর এক সংকটে নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। জাতিসংঘের সিডিপিও এই এসটিএস প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু একটি ভালো কৌশলপত্র প্রণয়ন বা সরকার পরিবর্তনের পরও তা বহাল রাখাই যথেষ্ট নয়— সরকারি পরিবর্তনের এই ক্রান্তিকালে কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা, সফল বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।করণীয়: সতর্ক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপপ্রথমত, রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাস্তব অগ্রগতি জরুরি। একক পণ্য তৈরি পোশাকের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা বিকশিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত, রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এলডিসি-উত্তর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন মেনে নতুন পথ খুঁজতে হবে। সরাসরি নগদ প্রণোদনার পরিবর্তে প্রযুক্তি তহবিল, উদ্ভাবন তহবিল বা স্টার্টআপ তহবিলের মতো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব নীতি-আলোচনায় উঠে এসেছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। আমদানি শুল্কনির্ভর রাজস্ব কমে এলে তার ঘাটতি পোষাতে প্রত্যক্ষ কর আদায় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছ করা ছাড়া বিকল্প নেই।চতুর্থত, দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে রপ্তানি খাত মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক প্রতিযোগিতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।পঞ্চমত, ওষুধ শিল্পকে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত নতুন বাস্তবতার জন্য আগেভাগে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ ও মূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে।ষষ্ঠত, এই পুরো প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। এলডিসি গ্রাজুয়েশন বিষয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততা তৈরি করে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষ—তাই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।শেষ কথাবাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা বিন্দু। প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংস্কারের কাজ পিছিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই—জাতিসংঘ নিজেই এই শর্ত জুড়ে দিয়েছে। সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে একই লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে এই উত্তরণ সত্যিকার অর্থেই একটি অগ্রগতির গল্প হয়ে ওঠে, ক্ষতির আখ্যান নয়। সতর্কতা ও সুচিন্তিত পদক্ষেপই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার, নাগরিক উদ্যোগ]
রাজনীতি
এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশ: সুবিধা হারানোর আগে সতর্ক প্রস্তুতি

শেয়ার করুন







