দীর্ঘ ৯৬ বছরের অপেক্ষা। ফুটবলের মহাযজ্ঞে কতবার কত পরাশক্তির দেখা হয়েছে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স আর সুইডেনের পথ কখনো একবিন্দুতে মেলেনি। অবশেষে কাটতে যাচ্ছে সেই শতাব্দীপ্রাচীন অপেক্ষা। আজ রাত ৩টায় নিউজার্সিতে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে তারা।
অথচ ৬৮ বছর আগেই স্টকহোমের রাসুন্দা স্টেডিয়ামে হতে পারত এই দুই দলের সাক্ষাৎ। ১৯৫৮ সালের সেই বিশ্বকাপে জুস্ত ফতেঁইন আর রেমন্ড কোপাদের ফ্রান্স ও নিলস লিডহোমের সুইডেনের ফাইনাল খেলার সব মঞ্চই প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ফুটবলের ঈশ্বর যেন অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। ১৭ বছর বয়সী এক তরুণ পেলের জাদুতে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ৫-২ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। ফলে সেই যাত্রায় ফরাসি ও সুইডিশদের দ্বৈরথ পিছিয়ে যায় প্রায় সাত দশক। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে ফ্রান্স খেলেছে ৭৬টি ম্যাচ, আর সুইডেনের ঝুলিতে আছে ৫৪ ম্যাচ। কিন্তু অদ্ভুত এক বিড়ম্বনায় কখনোই তারা একে অপরের মুখোমুখি হতে পারেনি। ফুটবল ইতিহাসে যেন এক নিখুঁত চোর- পুলিশ খেলা খেলেছে এই দুই দল।
১৯৫৮ সালের পরও বেশ কয়েকবার এই দুই দলের পথ এক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে সুইডেন যখন তৃতীয় হয়েছিল, ফ্রান্স তখন শেষ মুহূর্তে টুর্নামেন্ট থেকেই নাম প্রত্যাহার করে নেয়। আবার ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সুইডেন যখন তৃতীয় হয়েছিল, ফরাসিরা তখন বুলগেরিয়ার কাছে বাছাইপর্বের নাটকীয় হারে ঘরে বসে ছিল। পরে ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৮ ও ২০২২ সালে ফ্রান্স যখন ফাইনালে খেলেছে, সুইডেন হয় টুর্নামেন্টে ছিল না, নতুবা ড্রয়ের অন্য প্রান্তে থেকে আগেই বিদায় নিয়েছে। তবে মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট ইউরো বা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তাদের দেখা হয়েছে অনেকবার।
২০১২ ইউরোতে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের সেই চোখধাঁধানো ভলি কিংবা ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দুই দলেরই নিজেদের মাঠে ২-১ ব্যবধানের জয় এখনো টাটকা।
এবারের দৃশ্যপট অবশ্য বেশ ভিন্ন। গ্রুপপর্বে ৩ ম্যাচে ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম হট ফেবারিট হিসেবে নকআউটে এসেছে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। সুইডেনকে আসতে হয়েছে গ্রুপপর্বের অন্যতম সেরা তৃতীয় দল হয়ে, অলৌকিক কোনো প্রত্যাশার চাপ ছাড়াই। এই শক্তির ভারসাম্যটাই ম্যাচটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। সুইডিশ কিংবদন্তি ইব্রাহিমোভিচও ফ্রান্সের শক্তি নিয়ে অকপট, ‘এই ফ্রান্সকে হারানোর মতো দল আমি খুব বেশি দেখছি না। প্রতিপক্ষ শুধু তখনই সুযোগ পাবে, যদি ফরাসিরা নিজেরা গা এলিয়ে দেয় বা খেলার গতি কমিয়ে দেয়। তারা আসলেই অন্য স্তরের দল।’
তবে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর শিষ্যদের আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নিষেধ করেছেন। আর সুইডেনের কোচিং স্টাফের সদস্য সেবাস্তিয়ান লারসন মনে করিয়ে দিয়েছেন ২০১২ সালের সেই ইউরোর স্মৃতি, যেখানে তিনি নিজেই গোল করে ফ্রান্সকে হারিয়েছিলেন। রয়টার্সকে লারসন বলেন, ‘ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, আমরা অতীতে এর চেয়ে শক্তিশালী দলকে হারিয়েছি। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স হলেও আমাদের বিশ্বাস রাখার যথেষ্ট কারণ আছে।’
কাগজে-কলমে কে বিড়াল আর কে ইঁদুর, তা পরিষ্কার। তবে ফুটবল তো সব সময় চেনা ছকে চলে না। কখনো কখনো বিড়ালের থাবা গলে ইঁদুরও যে পালিয়ে যেতে পারে, তা ফুটবলে অনেকবার দেখা গেছে।








