মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন বা বিন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চল ও খাতভিত্তিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টার্নওভার কর নির্ধারণ করবে সরকার।
এছাড়া করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা, অনলাইন বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার হ্রাস, বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণে ভ্যাট আদায়ের নতুন ব্যবস্থা, ডিজিটাল ভ্যাট প্রশাসন জোরদার এবং কিছু বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহারসহ নানা পরিবর্তন এনে অর্থবিল পাস করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থবিল-২০২৬ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর আগে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোসহ কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনী আনার অনুরোধ জানান। পরে সেই সুপারিশ গ্রহণ করে অর্থবিলে পরিবর্তন আনা হয়।
এর ফলে আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা চার লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে এ সীমা ছিল পৌনে চার লাখ টাকা।
আরও পড়ুন
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ করে অর্থবিল পাস
অর্থবিলে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিআইএন বা বিন ব্যবহারের পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এখন কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খুলতে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে, মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে, ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্যপদ নিতে বা নবায়ন করতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নিতে এবং প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধন করতে চাইলে বাধ্যতামূলকভাবে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে আরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টার্নওভার কর ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। সরকার এখন গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অঞ্চল ও খাতভিত্তিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টার্নওভার কর নির্ধারণ করতে পারবে, যা দুই লাখ টাকার বেশি হবে না। অর্থাৎ সব ব্যবসার জন্য একই ধরনের করহার না রেখে ব্যবসার ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী আলাদা কর কাঠামো নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থাও পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান সেবা আমদানির মূল্য পরিশোধের সময় উৎসে ভ্যাট কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। একই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি শাখা থেকে বাংলাদেশে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা করযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থাও নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। নিবন্ধিত ও তালিকাভুক্ত করদাতারা প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার রিটার্ন দাখিল করবেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও শূন্য রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রনিক রিটার্ন বাধ্যতামূলক করতে পারবে।
কর ফাঁকি প্রতিরোধে তামাকজাত পণ্যে জাল ব্যান্ডরোল, স্ট্যাম্প বা কিউআর কোড ব্যবহার কিংবা অনুমোদিত ভ্যাট সফটওয়্যারে তথ্য বিকৃত করলে কঠোর আর্থিক দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রদত্ত সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থবিলে সোনা, রুপ্য, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারের ভ্যাট কাঠামো নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব অলংকার কেনার ক্ষেত্রে ৫০ পয়সা হারে উৎসে কর কাটার বিধান যুক্ত হয়েছে। হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচকেও সম্পূরক শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে এমএস পণ্য, স্ক্র্যাপ ও বিলেটের ভ্যাট কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে।
ব্যবসা ও শিল্পখাতে বেশকিছু কর-শুল্ক সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ভিডিওভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। চিংড়ি, ওষুধ, বৈদ্যুতিক তার, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, পরিশোধিত তামা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ভ্যাট এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজস্ব ভাগের ওপর আরোপিত ভ্যাটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশই থাকছে
কর প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়াতে ভ্যাট নিরীক্ষার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলে দুই মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি দিতে হবে এবং এক বছরের মধ্যে নিরীক্ষা শেষ করতে হবে। আপিল করতে দাবিকৃত করের মাত্র ১ শতাংশ জমা দিলেই চলবে। পাশাপাশি পুরোনো বকেয়া ভ্যাট, জরিমানা ও অন্যান্য পাওনা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করলে নির্ধারিত হারে সরল সুদ দিয়ে দায় নিষ্পত্তির বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।
আয়কর আইনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধন বা বার্ষিক বিক্রি রয়েছে- এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংঘের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিধানের বাইরে থাকবে। যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করে কর আরোপের বিধানও যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে সংসদে আলোচনার পর কয়েকটি বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে আগের মতো টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে। সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন এবং নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে অর্থবিলে যে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছিল, সমালোচনার মুখে সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, এ বিধান কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এসএম/ইএ








