সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায় প্রকাশের পর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন সাংবাদিকদের কাছে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘‘মামলায় মোট আসামি ছিলেন আটজন। বিচারক অনেক তথ্য-উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণ করে একজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। তিনজনকে যাবজীবন কারাদণ্ড এবং আরেকটা মামলায় একটা সেকশনে ১৪ বছরের সাজা দিয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।’’

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার।

পিপি আবুল হোসেন বলেন, ‘‘মামলায় বিচারক তিনজনকে খালাস দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ আসেনি। তাই তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা বিচার বিশ্লেষণ করে রায় আরও ভালো করে পড়ব। যদি আমরা মনে করি খালাস পাওয়া আসামিদের বিষয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, তাহলে আমরা উচ্চ আদালতে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করব।’’

মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর রহমান (২৮)। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জের সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৬)।

চারজন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তারা হলেন, দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির সালিক আহমদের ছেলে মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের ছেলে মিজবাউল ইসলাম রাজন (২৭)।

সকাল ৯টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আট আসামিকে আদালতে আনা হয়। এ সময় তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মামলার আসামিরা এজলাসে থাকেন। এরপর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার রায় ঘোষণা শুরু করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের মে মাসে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৪ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষিত গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে ২০ বছর বয়সী তরুণীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুজনকে আসামি করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের শাহপরান থানায় মামলা করেন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে আটজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তীতে আসামিরা আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের সরাসরি মিল পাওয়া যায়। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আটজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।