এশিয়ার বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মূল্যছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। তবে এই নজিরবিহীন দরপতনের পরও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় সৌদি ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো বেশি। ফলে ওপেক প্লাসের শীর্ষ এই রপ্তানিকারক দেশের তেল কেনার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব আগামী আগস্ট মাসের জন্য তাদের প্রধান ‘আরব লাইট’ তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১ মার্কিন ডলার কমিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ওমান ও দুবাইয়ের গড় দামের চেয়ে ১ দশমিক ৫০ ডলার কমে এশিয়ায় তেল বিক্রি করবে দেশটি। এ ছাড়া তাদের অন্য চারটি গ্রেডের তেলের দামও প্রতি ব্যারেলে সমান ১১ ডলার করে কমানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

খবরে আর বাজারে তেলের দাম এক হয় না কেন?

হঠাৎ কেন এই ছাড়

সৌদি আরবের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত গত জুনে হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে তেলের দাম কমে গেছে।

তেল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ক্রেতা আকর্ষণ করতে পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য সরবরাহকারীরাও তাদের তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। এর ওপর ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ায় বাজারে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।

এর আগে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছিল। তখন সৌদি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

আরও পড়ুন

বিশ্ববাজারে যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরলো তেলের দাম

বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার বিশ্লেষক এমা লি জানান, সৌদি আরবের এই মূল্যছাড় মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্পট গ্রেডের তেল বাজারে আরও অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে তেলের চাহিদা এখন বেশ দুর্বল। এর সঙ্গে ইরানি তেলের আগমন বাজারকে পুরোপুরি ক্রেতাদের অনুকূলে নিয়ে গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাডনক, ইরাকের সোমো এবং কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও ক্রেতা টানতে বড় ছাড়ে তেল বিক্রি করছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ইরানি অয়েল কোম্পানি তাদের ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা মুক্তির সুযোগে চীনের পাশাপাশি অন্যান্য এশীয় ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

আরও পড়ুন

তিন মাসে প্রথমবার ৮০ ডলারের নিচে নামল তেল

সৌদি তেল এখনো কেন ব্যয়বহুল

এশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগার ও ট্রেডিং সংস্থার সূত্রগুলো জানিয়েছে, দাম কমানোর পরও আগস্টে সৌদি তেল অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতি ব্যারেলে কয়েক ডলার বেশি পড়বে। এর মূল কারণ পারস্য উপসাগরের ভেতরে জাহাজ চলাচলের উচ্চ ভাড়া। উপসাগরের ভেতর থেকে তেল আনা এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল।

ভারতের একটি শোধনাগার সূত্র জানায়, তারা অন্যান্য প্রতিযোগী গ্রেডের তেল আরও অনেক কম দামে পাচ্ছেন। ফলে বেশি দাম দিয়ে সৌদি তেল কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

একজন ব্যবসায়ী জানান, ওমানের সোহার বন্দরে ট্রান্সফারের জন্য আরব আমিরাতের তেল দুবাইয়ের দরের চেয়ে ছয় থেকে আট ডলার কমে পাওয়া যাচ্ছে। বিপরীতে সৌদি আরবের রাস তানুকা বন্দর থেকে তেল আনতে জাহাজ ভাড়াই দ্বিগুণের বেশি পড়ে যাচ্ছে।

উপসাগরের ভেতর থেকে তেল খালাস করতে বাইরে তুলনায় ব্যারেলে প্রায় ১৫ ডলার বেশি খরচ হচ্ছে। ফলে আরামকো দাম ধরে রাখার চেষ্টা করলেও এশিয়ার বাজারে তাদের বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স
কেএএ/