গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ ভারী বৃষ্টির কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। মাটি সরে গিয়ে অন্তত ২৫টি স্থানে ধস দেখা দিয়েছে এবং তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। ঝুঁকিপূর্ণ এই বাঁধের ওপর দিয়ে পথচারী ও যান চলাচল অব্যাহত থাকায় জেলা শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, ঘাঘট নদীর ভাঙন ও বন্যা থেকে জেলা শহরকে রক্ষার জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্ষার আগে শুকনো মৌসুমে মেরামত করা হলে বাঁধটি আরও মজবুত ও টেকসই হতো। তাঁদের মতে, বর্ষাকালে মেরামতের কাজ করলে তা স্থায়ী হয় না।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বন্যা ও ভাঙন থেকে গাইবান্ধা জেলা শহরকে রক্ষা করতে ঘাঘট নদীর ডান তীরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। গাইবান্ধা সদর উপজেলার ভেড়ামারা থেকে গোরহাট পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিমে বাঁধটি নির্মিত। এটি চলাচলের রাস্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

পাউবো সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিনেও বাঁধটি টেকসইভাবে সংস্কার করা হয়নি। উত্তর পাশে নদীর দিকে অনেক জায়গায় সিসি ব্লক দেওয়া হলেও দক্ষিণ পাশে, অর্থাৎ জেলা শহরমুখী অংশে টেকসই কোনো কাজই হয়নি। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে ধস নামে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের কুটিপাড়া, ডেভিড কোম্পানিপাড়া ও জুম্মাপাড়া এলাকায় বাঁধের বেহাল অবস্থা। ভারী বৃষ্টির কারণে বাঁধের মাটি সরে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েকটি স্থানে বাঁধের নিচ থেকে মাটি কেটে ওপরে ফেলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই সেখানে পথচারী ও যানবাহন চলাচল করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধের বড় অংশ বালুমিশ্রিত মাটি দিয়ে নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি নিচে নামার সময় মাটি ক্ষয়ে ধীরে ধীরে বড় ফাটল তৈরি হচ্ছে।

ডেভিড কোম্পানিপাড়া বাঁধসংলগ্ন বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,`বৃষ্টি হলেই বাঁধের মাটি সরে যায়। বাঁধটি ধীরে ধীরে ধসে যাচ্ছে। একটানা ভারী বৃষ্টি হলে কী হবে, সেটা নিয়েই চিন্তায় আছি।'

শহরের সরকারপাড়া এলাকার জসিম উদ্দিন বলেন, “বালু মাটি দিয়ে বাঁধটি বাঁধার কারণে ধসে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণই বাঁধটির কাজ ভালোভাবে সম্পূর্ণ হচ্ছে না। বড় বন্যা হলেই শহর রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।”

শহরের কুটিপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, “বৃষ্টিতে মাটি সরে যাওয়ায় বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাঁধের কাঁচা রাস্তা দিয়ে ট্রলি চলাচল করায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এ জন্য বাঁধের ওপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়েও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”

একই এলাকার চাকরিজীবী জাহেদুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টিতে বাঁধের মাটি ক্ষয়ে গেছে। কখনো স্থায়ীভাবে মেরামত করা হয়নি। বাঁধটির অনেক জায়গা নিচু ও সরু হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় সাইকেল-মোটরসাইকেল ছাড়া ভ্যান চলাচল করতে পারে না। সময়মতো সংস্কার না করায় অনেক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু বর্ষা এলে লোক দেখানো মাটি ও বালুর বস্তা ফেলা হয়।”

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে ভারী বৃষ্টি হলেও ধসে যাওয়া স্থানগুলো মেরামতে পাউবো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ১৪ জুন দুপুরে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ক্ষতিগ্রস্ত শহর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেন। তাঁর নির্দেশে পরদিন থেকে শুধু শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়া এলাকায় ধসে যাওয়া অংশে কিছু বালুর বস্তা ফেলা হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন,`বাঁধটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বাঁধের বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে।'

গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, `ভারী বৃষ্টির কারণে বাঁধের কিছু অংশে ধস দেখা দিয়েছে। তবে চিন্তার কারণ নেই। যাতে বড় ধরনের ক্ষতি না হয়, সেজন্য ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে মাটির বস্তা ফেলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছয়-সাতটি স্থানে বস্তা ফেলে ভরাট করা হয়েছে। বাঁধের মেরামত কাজ চলমান।'