পানি বাড়া-কমায় গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। অন্তত ৬০টি পয়েন্টে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা বাসিন্দারা।

গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুর ২টা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৮৬ সেন্টিমিটার ও গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৯০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

সরেজমিন দেখা গেছে, তীব্র ভাঙনে নদীঘেঁষা বসতভিটা, গাছপালা, বাঁশঝাড় ও আবাদি জমিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে জমি। অনেকেই গাছ কেটে এবং ঘরবাড়ি সরিয়ে যা সম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কেউ ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে নিচ্ছেন।

গাইবান্ধায় তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন, আতঙ্কে মানুষ

জেলার ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ রসুলপুর এলাকাসহ জেলার অন্তত আরও ১০টি পয়েন্টে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভাঙনে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা ও ফসলি জমি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপসিয়া ইউনিয়নের লাল চামার কেরানীর চর এলাকায় অব্যাহত ভাঙনে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। শত বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের শিকার হয়েছে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর এলাকা।

আরও পড়ুন

‘সব নদীতে চলে গেছে, শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি’

ফুলছড়ির রসুলপুর গ্রামের কৃষক সাহেব উদ্দিন বলেন, ‌‌‘১০-১৫ দিনে থেমে থেমে ভাঙনে এখানকার একটি পয়েন্টেই ২০-৩০ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যেখানে বেশিরভাগই ষোলআনা ফসল ফলতো। এখনো যদি ভাঙন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া যায়, আশপাশের পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

নদীভাঙনের মুখে পড়া বাসিন্দা নুরী আকতার বলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে এখানে একটু একটু করে নদী ভাঙছে। গত এক সপ্তাহ থেকে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, কেউ কোনো কিছুই রক্ষা করতে পারেনি। গাছ-গাছালি, বাঁশঝাড়—সবকিছু নদীতে নিমিষেই তলিয়ে গেছে। এখন শুধু কয়েকটা বাড়িঘর আছে।’

গাইবান্ধায় তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন, আতঙ্কে মানুষ

কৃষক চান্দু মিয়া বলেন, ‘হঠাৎ করে সকালে ভাঙনে আমার বড় বড় আমগাছ, জামগাছ, মেহগনি, জাম্বুরা, আতাগাছ ও বাঁশঝাড় সব কিছুই নদীর মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। আতঙ্কে ঘর খুল ফেলছি। অন্য কোথাও যেতে হবে।’

হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘সবাই এসে শুধু আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজ করে না। শুনি বরাদ্দ হয়েছে, কিন্তু কাজ না হওয়ায় আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়লাম।’

রেজিয়া বেওয়া নামের আরেকজন বলেন, ‘মাটির কাজ করে ১০ শতক জায়গা করেছিলাম। কিন্তু তা নদীতে ভেঙে গেল। কয়দিন আগে তিনটা গাছ, আজ আবার চারটা গাছসহ ১০ শতক জমি নদী গিলে খেলো। কোথায় থাকবো, কে দেখবে?’

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েকদিন আগে ভাঙনের খবরে স্থানটিতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), চেয়ারম্যান ও সরকারি লোক পরিদর্শন করে গেলেও ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এখনো চোখে পড়েনি। ফলে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই যাচ্ছে।

গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘নদ-নদীর পানি বেড়ে প্রায় ৯০০ বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ফসলের ক্ষতি হয়েছে সুন্দরগঞ্জে।’

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এবার বন্যার পানি দীর্ঘমেয়াদি হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে। যেসব এলাকায় নদী বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেসব এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করার চেষ্টা চলছে।

এএনএইচএস/এসআর/জেআইএম