অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন ফিলিস্তিনি সমাজকর্মী মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি। সম্প্রতি গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ এবং দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি অঞ্চলের শরণার্থীশিবিরগুলোতে বড় পর্দায় ২০২৬ বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন। যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের মুখে খানিকটা হাসি ফোটাতে এবং ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে একটু স্বস্তি দিতেই তিনি প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখানোর আয়োজন করেছিলেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে মিসরের শেষ ১৬-র একটি ম্যাচ বড় পর্দায় প্রদর্শনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান আল-ওয়াহিদি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলে গাজা সিটির সাবরা অঞ্চলের একটি সড়ক দিয়ে ট্যাক্সিযোগে যাচ্ছিলেন ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-ওয়াহিদি। এই সময় ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ট্যাক্সিটি লক্ষ্য করে একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। হামলায় ট্যাক্সির ভেতরে থাকা আল-ওয়াহিদিসহ মোট চারজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

তাঁর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো গাজা উপত্যকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাস্তুচ্যুত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত লাখ লাখ ফিলিস্তিনির কাছে ওয়াহিদি ছিলেন অন্যতম চেনা এবং আশার আলো দেখানো এক মানবিক মুখ। তাঁর মৃত্যুর পর গাজার অধিকারকর্মী মোহাম্মদ হুমাইদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তিনি কেবল একজন সাধারণ ত্রাণকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের বেঁচে থাকার আশার আলো।’

এদিকে এই বর্বরোচিত হামলার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা মূলত হামাসের এক শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছিল। এই ঘটনায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার যে দাবি উঠেছে, তা তারা খতিয়ে দেখছে।

পেশায় ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন আল-ওয়াহিদি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি গাজায় মিসরীয় ত্রাণ কমিটির (ইজিপশিয়ান রিলিফ কমিটি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি গাজায় জরুরি খাদ্য সহায়তা সমন্বয়, বাস্তুচ্যুত পরিবারের জন্য তাঁবু এবং ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরে বসে কাজ করার চেয়ে তিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে ত্রাণ বিতরণ করতেই বেশি পছন্দ করতেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৫৯৩ জন সমাজকর্মী ও জাতিসংঘ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ১১৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই নারী ও শিশু।