গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় নিয়োগপত্র বাতিল হওয়া বিখ্যাত ইসরায়েলি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ রাজ সেগালকে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় তিন কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা (ইউএমএন)।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘সেন্টার ফর হলোকাস্ট অ্যান্ড জেনোসাইড স্টাডিজ’-এর পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের জুনে রাজ সেগালের নিয়োগপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাছাই কমিটির সর্বসম্মত সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও দাতাসংস্থা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ইসরায়েল সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর প্রবল চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার দুই বছরেরও বেশি সময় পর কোনো পক্ষ নিজেদের আইনি দোষ স্বীকার না করেই এই আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছাল।
রাজ সেগাল নিজেও ইহুদি এবং তাঁর চার দাদা-দাদিই হলোকাস্টের ভুক্তভোগী ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। বর্তমানে নিউজার্সির স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ে হলোকাস্ট ও গণহত্যা বিষয়ক বিভাগে অধ্যাপনা করছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে সেগাল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ধরে নিয়েছিল আমি ঠিক উপযুক্ত ধারার ইসরায়েলি বা ইহুদি নই।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ক্ষতিপূরণের খবর ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে শাস্তির মুখে পড়া অন্য গবেষক ও অধ্যাপকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উৎসাহিত করবে।
আইনি লড়াইয়ে সেগালের প্রতিনিধিত্বকারী ‘সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস’-এর উপ-আইনবিষয়ক পরিচালক মারিয়া লাহুদ বলেন, ‘ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করার কারণেই রাজ সেগালের নিয়োগ বাতিল করা হয়, যা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ও শিক্ষায় একাডেমিক স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার কয়েক দিনের মাথায় ‘জুয়িশ কারেন্টস’ সাময়িকীতে একটি মতামত প্রকাশ করেন রাজ সেগাল। সেখানে তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে ‘গণহত্যার এক পাঠ্যবইতুল্য উদাহরণ’ (textbook case of genocide) বলে অভিহিত করেন।
যদিও সেগাল নিবন্ধে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে হামাসের হামলা একটি ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সমতুল্য’, তবুও ইসরায়েল সমর্থক একাধিক পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে হামাসের সহিংসতা সমর্থনের অভিযোগ তোলে।
ফাঁস হওয়া ই-মেইলে দেখা যায়, নিয়োগের খবর প্রকাশ পাওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়। এক প্রধান দাতা সরাসরি হুমকি দেন যে, রাজ সেগালকে নিয়োগ দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া ৬৯ জন রাজ্য আইনপ্রণেতা যৌথ চিঠি পাঠিয়ে এই নিয়োগ বন্ধের দাবি জানান।
প্রাথমিকভাবে রাজ সেগালের বাকস্বাধীনতা ও একাডেমিক যোগ্যতার পক্ষে দাঁড়ালেও, চাপের মুখে পরবর্তীতে নিয়োগপত্র প্রত্যাহার করে নেন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ এটিঙ্গার।
মিনেসোটার ‘জুয়িশ কমিউনিটি রিলেশনস কাউন্সিল’ (জেসিআরসি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইথান রবার্টস বলেন, ‘বিতর্কটি সেগালের নিজস্ব মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ছিল না। প্রশ্ন ছিল, এমন দৃষ্টিভঙ্গির একজন ব্যক্তি হলোকাস্ট সেন্টারের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উপযুক্ত কি না।’
অন্যদিকে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৪০ জন হলোকাস্ট ও গণহত্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সেগালের সমর্থনে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক চাপে নিয়োগ বাতিলের এই ঘটনা একাডেমিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এই ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস করেন।০
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে আইনি বিরোধের সমাপ্তি ঘটলেও রাজ সেগাল আর ওই পদে যোগ দিচ্ছেন না। সেন্টার ফর হলোকাস্ট অ্যান্ড জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালকের পদটি এখনো খালি রয়েছে।








