যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে ২০২৪ সালে বিধ্বংসী হারিকেন হেলেন আঘাত হানার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সদ্য প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ফক্স নিউজে উপস্থিত হয়ে সাউথ ক্যারোলাইনায় দুর্যোগ–পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

সেখানে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে গ্রাহাম হারিকেন মোকাবিলায় তৎকালীন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এরপর হঠাৎ করেই এই সিনেটর সে প্রসঙ্গ থেকে সরে যান। নিজের অঙ্গরাজ্যে হারিকেন–পরবর্তী দুর্দশা নিয়ে কথা বলা বাদ দিয়ে গাজা যুদ্ধ নিয়ে তিনি কথা বলা শুরু করেন। অথচ সে সময় তাঁকে গাজা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। ওই বক্তব্যে তিনি কেবল ইসরায়েলকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গেছেন।

কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনে গ্রাহাম ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণে সমর্থন করেছিলেন, রাশিয়া ও চীনের কট্টর বিরোধিতা করেছিলেন, ইসরায়েলের প্রতি অটল ও সীমাহীন সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম সোচ্চার সমর্থক ছিলেন।

গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘আমি সাউথ ক্যারোলাইনার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বেশির ভাগ মানুষের মতো আমিও ঘুমাতে পারিনি। কিন্তু ইসরায়েলে কী ঘটেছে, সেটাও দেখুন।

কড়া ইসরায়েলপন্থী হিসেবে পরিচিত এই সিনেটর বলেন, ‘আমাদের বন্ধু ইসরায়েল এমন সব মানুষের দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা তাদের হত্যা করতে, ধ্বংস করতে চায়। দ্বিতীয় একটি হলোকাস্টের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, আর বাইডেন বলছেন, “সংযতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান”। যাঁরা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে হত্যা করতে চান, তাঁদের প্রতি সংযত প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? ইসরায়েলে গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছে। আমাদেরকে আমাদের বন্ধুদের সাহায্য করতে হবে।’

গত শনিবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর কার্যালয় থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

লিন্ডসে গ্রাহাম সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর পররাষ্ট্রনীতির সমর্থন করে গেছেন এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অটল সমর্থনের দিকে মনোযোগ ধরে রাখার উপায় খুঁজে নিতেন।

গ্রাহামের মৃত্যুর খবর জানার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গত রোববার নেতানিয়াহু বলেন, রিপাবলিকান এই আইনপ্রণেতা প্রায়ই ইসরায়েলের জন্য তাঁর সরকারের চাওয়া বা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি মার্কিন সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন।

কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনে গ্রাহাম ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণকে সমর্থন করেছিলেন, রাশিয়া ও চীনের কট্টর বিরোধিতা করেছিলেন, ইসরায়েলের প্রতি অটল ও সীমাহীন সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম সোচ্চার সমর্থক ছিলেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ থিংকট্যাঙ্কের যুক্তরাষ্ট্র কর্মসূচির পরিচালক মাইকেল হান্না বলেন, রাজনৈতিক জীবনের দুটি দিকই প্রয়াত এই সিনেটরের অবস্থানকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য যথেষ্ট। সেগুলো হলো সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাঁর অটল সমর্থন।

ইরাক ও আফগানিস্তানে এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনীতিককে নিজেদের যুদ্ধপন্থী হিসেবে তুলে ধরা এড়িয়ে চলতে দেখা গেছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শান্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু লিন্ডসে গ্রাহাম কখনো তা করেননি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে তিনি অনড় অবস্থানে ছিলেন।

চলতি বছরের শুরুতে গ্রাহাম যখন লেবাননের ওপর ইসরায়েলের বোমা হামলায় মার্কিন বাহিনীকেও অংশ নিতে বলেন, তখন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টিম বারচেট সামরিক হামলার প্রতি সিনেটরের অতিরিক্ত আগ্রহকে কটাক্ষ করেছিলেন।

ইসরায়েল ও সিরিয়া সীমান্ত পরিদর্শন করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (ডান থেকে দ্বিতীয়), যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান (ডানে)। ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমিতে, ১১ মার্চ ২০১৯

সম্পূর্ণরূপে ইরায়েলপন্থী

প্রয়াত এই রিপাবলিকান রাজনীতিক প্রায়ই ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি সামরিক সহায়তার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্যে জোরালো অবস্থান নিতেন।

২০২১ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর গ্রাহাম ইসরায়েলে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে ‘মোর ফর ইসরায়েল’ লেখা একটি সাইনের পাশে ছবি তোলেন।

এরপর এই ইসরায়েলপন্থী মার্কিন সিনেটর দেশটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করেন।

গ্রাহামের মৃত্যুর খবর জানার পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গত রোববার নেতানিয়াহু বলেন, রিপাবলিকান এই আইনপ্রণেতা প্রায়ই ইসরায়েলের জন্য তাঁর সরকারের চাওয়া বা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি মার্কিন সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন।

নেতানিয়াহু ফক্স নিউজকে বলেন, ‘গ্রাহাম আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে তিনি এমনকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বজায় রাখা, এমনকি তা বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে লড়াই করেছিলেন।’

ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরসহ বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা গ্রাহামের মৃত্যুর পর শোক জানিয়েছেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন।

কখনো কখনো গ্রাহামের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান সরাসরি ফিলিস্তিনিদের প্রতি ক্ষোভ ও অমানবিক রূপ নিত। বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে তিনি ফিলিস্তিনি জনগণকে নাৎসিদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করাও ন্যায্য হতে পারে।

অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ভিত্তি গঠনকারী অনেক চুক্তিই প্রণয়ন করা হয়েছিল, যাতে ওই যুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের মতো নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি না হয়।

কিন্তু গ্রাহামের বক্তব্যে মনে হতো, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নির্যাতন–নিপীড়ন তিনি দেখতেই পান না।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধের শুরুতে গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে একটি ধর্মযুদ্ধে রয়েছি। আমি ইসরায়েলের পাশে আছি। নিজেদের রক্ষার জন্য যা করার দরকার, তা–ই করুন। পুরো জায়গাকে ধ্বংস করে দিন।’

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের প্যালেস্টিনিয়ান কমিউনিটি নেটওয়ার্কের (ইউএসপিসিএন) প্রধান হাতেম আবুদায়্যেহ প্রয়াত সিনেটর গ্রাহামকে ‘আরেকজন অপরাধী যুদ্ধবাজ’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি বিশ্বজুড়ে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞকে সমর্থন করতে করতেই তাঁর পরিণতি বরণ করেছেন।

হাতেম আবুদায়্যেহ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘লিন্ডসে গ্রাহাম তাঁর রাজনৈতিক জীবনজুড়ে যুদ্ধ, দখলদারত্ব ও গণহত্যার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। ইতামার বেন–গভির ও নেতানিয়াহুর মতো গণহত্যাকারী ব্যক্তিরা তাঁর প্রশংসা করছেন—এটিই অনেক কিছু বলে দেয়।’

মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুতে কেন শোকে বিহ্বল ইসরায়েলি নেতারা