তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের ফলে রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের বড়াইবাড়ি-মিনা বাজার ও মিনা বাজার-কালিগঞ্জ খেয়াঘাট এলাকার দুটি প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁধ দুটির বিভিন্ন স্থান ইতোমধ্যে ধসে গেছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের বসতভিটা, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা এবং হাজার হাজার একর কৃষিজমি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভাঙনের মুখে ওই এলাকার ১৫ হাজার পরিবার চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। তাদের বাসাবাড়ি, আবাদি জমিসহ সব ধরনের স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রোববার দুপুরে গংগাচড়া উপজেলায় তিস্তার ভাঙন পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট থেকে মিনা বাজার পর্যন্ত নির্মিত নদীরক্ষা বাঁধের একাধিক স্থানে মাটি ধসে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর তীব্র স্রোত বাঁধের একেবারে গা ঘেঁষে আঘাত হানছে। একই চিত্র দেখা গেছে মিনা বাজার থেকে কালিগঞ্জগামী খেয়াঘাট পর্যন্ত নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ২০২৪ সালে এলাকাবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩২ লাখ টাকা। একই সময়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মিনা বাজার থেকে কালিগঞ্জগামী খেয়াঘাট পর্যন্ত আরও একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায়। সম্প্র্রতি তিস্তার পানি বৃদ্ধি ও স্রোতের তীব্রতায় দুটি বাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙন শুরু হওয়ায় এই বাঁধ দুটি হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয়রা দাবি জানালে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজীর সুপারিশে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ৪০০টি জিও ব্যাগ সরবরাহ করেছে। তবে স্থানীয়রা জানান, নদীর ভয়াবহ ভাঙনের তুলনায় এই ব্যবস্থা অপ্রতুল।

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন ও শহিদুল মিয়া বলেন, প্রতিদিনই তিস্তার ভাঙনে বাঁধের অংশ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে আগামী কিছু দিনের মধ্যে পুরো এলাকা ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। তারা বলেন, জিও ব্যাগ দিয়ে সাময়িকভাবে কিছু জায়গা রক্ষা করা গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। নদীর স্রোত বাড়লে এসব ব্যাগ টিকবে না। দ্রুত ব্লক পিচিং করা প্রয়োজন। ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু একটি বাঁধের বিষয় নয়, হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে ব্লক পিচিংয়ের কাজ শুরু করা প্রয়োজন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড এ নিয়ে কোনা উদ্যোগ নিচ্ছে না।

স্থানীয়দের দাবি, বাঁধ দুটিকে স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকার একটি ব্লক পিচিং প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা প্রকল্পটির সুপারিশ করে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাঠান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন পায়নি। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চর বাগডহরা, মিনা বাজার, পূর্বপাড়া, মেম্বারপাড়া, শখেরবাজার ও মটুকপুরসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার পরিবার বসবাস করে। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। তিস্তার তীরবর্তী এসব এলাকায় হাজার হাজার একর জমিতে ধান, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। জনস্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ দুটিতে ব্লক পিচিংয়ের কাজ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।