গ্রামে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন গৌরীপুরের রামগোপালপুর ইউনিয়নের ধুরুয়া ভাষাবদ্ধ গ্রামের মোখলেছুর রহমান। একই গ্রামের আব্দুল কাদের তাকে প্রতি মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনে গ্রিসে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে লিখে নিয়েছেন ৩৩ শতাংশ জমি ও পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু গ্রিসে তার যাওয়া হয়নি। লিবিয়ায় নির্মম নির্যাতন আর জেল খাটার পর তাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। তার মতোই কাদেরের খপ্পরে পড়ে জুলাইযোদ্ধা ইমরান হাসান লাদেন, মোস্তাকিম হাসান, দীন ইসলাম, মামুন মিয়া, আশরাফুল আলম উজ্জ্বলসহ অনেকেই লিবিয়ার জেলখানায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। লিবিয়ার জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া মোখলেছুর রহমান সেই নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। মোখলেছুর রহমান বলেন, বাড়িতে কৃষিকাজ করে ভালোই চলছিল। একদিন আব্দুল কাদের জানায় গ্রিসে তার ছেলে নাঈম রয়েছে। সেখানে স্ট্রবেরি বাগানে কাজ করলে প্রতি মাসে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া যাবে। এই স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি ইউরোপ যেতে রাজি হন। চুক্তি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকার মধ্যে নগদ দেন পাঁচ লাখ টাকা আর নিজের ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩ শতাংশ জমি তাকে লিখে দেন। চুক্তি অনুযায়ী মোখলেছুর রহমান ২ এপ্রিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে প্রথমে সৌদি আরব যান। সেখানে তাকে ওমরা হজ করানো হয়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে তাকে আটক করে লিবিয়ার সেনাবাহিনী। প্রথমে তিন দিন একটি ছোট্ট বন্দিশালায় তাকেসহ ১৪ জনকে আটকে রাখে। ছোট্ট সেই ঘরে তিন দিনই তাদের দাঁড়িয়েই কাটাতে হয়েছিল। তাদের তখন কোনো খাবারও দেওয়া হয়নি। মোখলেছুর বলেন, এরপরে তাদের নেওয়া হয় বেদা জেলখানায়। সেখানে তাদের বন্দি থাকতে হয় ২৭ দিন। খাবার হিসাবে সকালে ৫০ গ্রাম ওজনের পাউরুটি আর রাতে দেওয়া হতো সামান্য পাস্তা। কোনো পানি দেওয়া হতো না। এ জেলখানায় সকালে-বিকালে চলত নিয়মিত নির্যাতন। হাতে-পায়ে ধরেও তারা রেহাই পায়নি। সেখানে ২শ’র উপরে বাংলাদেশি বন্দি রয়েছে। এরপরে তাকে নেওয়া হয় গাম্ভোজা জেলখানায়। সেখানেও চলে নির্যাতন। এ জেলখানায় গিয়ে দেখেন প্রায় হাজারখানেক বাংলাদেশি বন্দি। এ নির্যাতন ও জেলখানায় বন্দির ঘটনা কাদের ও ছেলেকে জানালেও মুক্ত করতে তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অবশেষে তার পরিবার দুই লাখ টাকা খরচ করে লিবিয়ার জেলখানা থেকে তাকে মুক্ত করে আনেন। মোখলেছুর জানান, গ্রিসের স্বপ্ন দেখিয়ে আমার কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে কাদের আমার জমিতেই ভবন নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে একই গ্রামের মো. ওয়াহেদ আলী জানান, তার ছেলে আসাদ উল্লাহ উজ্জলকে গ্রিসে নেওয়ার কথা বলে কাদের ১২ লাখ টাকা নিয়েছে। কাদের বলছে, সেখানে গেলেই চাকরি হবে। কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু তাকে অবৈধভাবে পাঠাতে গিয়ে লিবিয়ার জেলে বন্দি রয়েছে প্রায় এক বছর হলো। ওকে ছাড়িয়ে আনার জন্য কাদের আরও এক লাখ টাকা নিয়েছিল। কিন্তু মুক্ত করতে না পেরে টাকা ফেরত দিয়েছে। কাদেরের বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনেও কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। তবে মোখলেছুর রহমানকে বিদেশে নেওয়ার জন্য আব্দুল কাদের জমির দলিল করেছে এবং কিছু টাকা দিয়েছে বলে স্বীকার করেন তার মা নূরজাহান বেগম। তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে কাউকে জোর করে বিদেশ নেয়নি। সবাই অনুনয়-বিনয় করে গেছে। আমার ছেলে মোখলেছকে নিতে চেয়েছিল। সেই তো পরে চলে আসছে।