গ্রীষ্মের দাবদাহ এখন শুধু বাইরের পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্দরমহলেও তৈরি করছে অস্বস্তিকর। তীব্র গরম, আর্দ্রতা এবং বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ মিলিয়ে বাসার ভেতরে আরামদায়ক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের জন্যই এসি এখনো এক বিলাসিতার নাম। তাই প্রচণ্ড গরমে একটু শান্তির জন্য খুঁজতে হয় বিকল্প ব্যবস্থা। কিছু সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করলে ঘরকে তুলনামূলক ঠান্ডা রাখা সম্ভব। প্রকৃতির রুদ্ররূপকে হয়তো আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না, তবে জীবনযাত্রায় এ ছোট পরিবর্তনগুলো আনলে তীব্র গরমেও আপনার প্রাঙ্গণটি হয়ে উঠবে এক টুকরা শান্তির নীড়।
ক্রস ভেন্টিলেশন
অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করেই বাড়িকে শীতল রাখার কার্যকরী উপায়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ক্রস ভেন্টিলেশন। আপনার বাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপ দূর করতে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিন। আর এর জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে সন্ধ্যা থেকে দুপুরের কড়া রোদ ওঠার আগ পর্যন্ত। যদি মশা কিংবা পোকামাকড় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন তাহলে জানালায় নেট লাগিয়ে নিতে পারেন। এতে ঘরের তাপ বের হয়ে যাবে এবং প্রাকৃতিক ঠান্ডা বাতাসে ঘর পরিপূর্ণ হবে।
হালকা রঙের পর্দা ব্যবহার করুন
ঘর গরম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সরাসরি সূর্যের আলো। বিশেষ করে পশ্চিম ও দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে বেশি তাপ প্রবেশ করে। তাই দিনের বেলায় পর্দা টেনে রাখা জরুরি। হালকা রঙের যেমন-সাদা, ক্রিম, বেইজ, ধূসর, আকাশি, হালকা সবুজ, প্যাস্টেল শেড বা ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার করলে সূর্যের তাপ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়। এ ছাড়া বাঁশের চিক, সানশেড বা রিফ্লেক্টিভ পর্দাও কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখতে বিছানার চাদর ও কুশন কভারেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সুতি কাপড় তাপ কম ধরে রাখে তাই সুতি চাদর ও হালকা রঙের কাপড় ব্যবহার করা ভালো। যদি সম্ভব হয়, জানালার বাইরের দিকে ছাউনি বা শেড তৈরি করা যেতে পারে। এতে সূর্যের আলো সরাসরি কাচে পড়বে না এবং ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকবে।
বাতাস চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন
ফ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু কৌশল আছে। এয়ার কুলারের বদলে ফ্যানের সামনে বরফভর্তি বাটি বা ঠান্ডা পানি রাখা হলে বাতাস কিছুটা শীতল অনুভূত হয়। সিলিং ফ্যান নিয়মিত পরিষ্কার রাখাও জরুরি, কারণ ধুলাবালি জমলে বাতাসের প্রবাহ কমে যায়।
ঘরের ভেতরে তাপ উৎপাদন কমান
আমরা অনেক সময় এটি উপলব্ধি করতে পারি না যে, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আমাদের বাড়ির ভেতরে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। অযথা চালিয়ে রাখা বেশিরভাগ নিষ্ক্রিয় ডিভাইস থেকেও তাপ নির্গত হয়। তাই ব্যবহার না করলে বাড়ির ইলেকট্রিক ডিভাইসটি অবশ্যই বন্ধ রাখুন। স্মার্ট পাওয়ার স্ট্রিপ ব্যবহার করতে পারেন। অতিরিক্ত গরম এড়াতে চার্জার, ওয়াশিং মেশিন, ডিশওয়াশার, চুলা, ওভেন ইত্যাদি দিনের বেলায় ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। দুপুরের প্রচণ্ড গরমে ভারী রান্না এড়িয়ে সকাল বা সন্ধ্যায় রান্না করা ভালো। প্রেসার কুকার, এয়ার ফ্রায়ার বা কম তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার করলেও কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়।
ঘরে গাছ রাখুন
প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর ঠান্ডা রাখার অন্যতম উপায় হলো গাছ। ঘরের বারান্দা, জানালার পাশে বা ছাদে গাছ রাখলে তা তাপ শোষণ করে পরিবেশকে কিছুটা শীতল রাখে। মানিপ্ল্যান্ট, অ্যালোভেরা, স্নেক প্ল্যান্ট, আরেকা পাম বা ছোট ইনডোর গাছ ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে। বারান্দায় টবের গাছ বা লতানো গাছ রাখলে বাইরের তাপ সরাসরি দেওয়ালে আঘাত করতে পারে না, ফলে ঘরের ভেতর কম গরম লাগে।
ছাদ ও দেওয়ালের যত্ন নিন
বাংলাদেশে অনেক বাড়ির ছাদ সরাসরি সূর্যের তাপে উত্তপ্ত হয়ে যায়। ছাদে সাদা রং বা কুল রুফ কোটিং ব্যবহার করলে তাপ শোষণ কম হয়। ছাদে পানি ছিটানো বা টবের গাছ রাখা সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। দেওয়ালে হালকা রং ব্যবহার করলেও সূর্যের তাপ কম শোষিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
শরীর ঠান্ডা রাখুন
ঘর ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি নিজেকেও ঠান্ডা রাখা প্রয়োজন। ক্যাফেইনজাতীয় পানীয় এড়িয়ে প্রচুর পানি, ডাবের পানি ও স্যালাইন খান। হালকা পোশাক পরা, সুতির কাপড় ব্যবহার এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে অপ্রয়োজনীয় কাজ এড়িয়ে চলা শরীরকে আরাম দেয়। রাতে পাতলা বিছানা ও হালকা কম্বল ব্যবহার করলেও ঘুম ভালো হয়।
গ্রীষ্মের দাবদাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও কিছু পরিকল্পিত পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘরকে আরামদায়ক রাখা যায়। অপ্রয়োজনীয় তাপ কমানো, প্রাকৃতিক উপায় গ্রহণ করে এবং বিদ্যুৎনির্ভরতা কমিয়েও ঘরে স্বস্তি আনা সম্ভব।








