হাঁটতে পারেন না স্বামী-স্ত্রী দুজনই। স্ত্রী শাহিদা জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী আর স্বামী দেলোয়ার ক্যানসার আক্রান্ত হলে কেটে ফেলতে হয়েছে একটি পা। এই অসহায় দম্পতির সম্পত্তি বলতে ছিল একটি পাটকাঠির বেড়া দেওয়া বসতঘর। সেটাও দুই বছর আগে ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। থাকার কোনো জায়গা নেই তাদের। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে শাহিদা বেগম ও তার স্বামী দেলোয়ার বর্তমানে অসহায় জীবনযাপন করছেন।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের খোয়াজপুরের ৬নং ওয়ার্ডের হাতেম বেপারীর মেয়ে শাহিদা বেগম (৩৭) জন্মগতভাবেই প্রতিবন্ধী। দুটি পা সরু ও বাঁকা। তাই হাঁটতে পারেন না তিনি। এমন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে তার পরিবারের জন্য। পরবর্তীতে একই এলাকার হালাল সরদারের ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৫০) ভালোবেসে বিয়ে করেন শাহিদাকে। পরে শাহিদার বাবার বাড়িতেই অল্প কিছু জায়গা দিলে সেখানেই ঘর তুলে সংসার জীবন শুরু করেন তারা।

ঘরের অভাবে দিশাহারা প্রতিবন্ধী দম্পতির উদ্বাস্তু জীবন

দুই বছর আগে হঠাৎ ঝড়ের কবলে ভেঙে যায় তাদের একমাত্র সম্বল মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু। থাকার জন্য কোনো ঘর না থাকায় কোনা উপায় না পেয়ে ঢাকার একটি বস্তিতে থাকা শুরু করেন প্রতিবন্ধী দম্পতি। সেখানে ভিক্ষা করে কোনো রকমভাবে বেচে আছেন তারা।

আরও পড়ুন

প্রবীণ সাংবাদিক মো. শাহজাহানের চিকিৎসায় সহায়তার আবেদন

১১ বছরের সংসার জীবনে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। মেয়ে ফাতেমা আক্তার (৯) ঢাকার একটি মাদরাসায় পড়ে। আর প্রতিবন্ধী দম্পতি ভিক্ষা করতে গেলে বস্তির পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে খেলতে গিয়ে ছেলে সালমান হোসেন (৫) মারা যায়। এরপর থেকে অসহায় শাহিদা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন। বর্তমানে তিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঢাকার বস্তিতে থাকতে তাদের কষ্ট হয়। তাছাড়া মেয়েও বড় হচ্ছে। সব মিলিয়ে তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে চান। কিন্তু টাকার অভাবে ভেঙে পড়া বসতঘরটি ঠিক করতে না পারায় অসহায় হয়ে পড়েছেন প্রতিবন্ধী দম্পতি। তাদের একমাত্র চাওয়া কেউ যদি তাদের এই ঘরটি ঠিক করে দিত, তাহলে বাকি জীবনটা একটু নিরাপদে থাকতে পারতেন।

ঘরের অভাবে দিশাহারা প্রতিবন্ধী দম্পতির উদ্বাস্তু জীবন

প্রতিবন্ধী দেলোয়ার হোসেন বলেন, হঠাৎ আমার পায়ে ঘা হয়। সেই ঘা থেকে ক্যানসার হয়। পরে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে প্রায় দুই বছর আগে আমার একটি পা হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়। এর পরই আমাদের সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। খেয়ে না খেয়ে কোনোরকম বেঁচে আছি। আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে তা জানি না। আমরা দুইজনই প্রতিবন্ধী হওয়ায় চরমভাবে অসহায় হয়ে পড়েছি। আমাদের শেষ সম্ভল বসতঘরটিও ঝড়ে পড়ে গেছে। টাকার অভাবে দুই বছর ধরে ঠিক করতে পারি না। সবাই একটু সহযোগিতা করলেই হয়ত ঘরটি ঠিক করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

প্রতিবন্ধী যমজ ছেলেকে নিয়ে লড়ে চলেছেন বাবা-মা, প্রয়োজন একটু সহায়তা

প্রতিবন্ধী শাহিদা বেগম বলেন, আমি জন্ম থেকেই হাঁটতে পারি না। আমাদের থাকার একমাত্র ঘরটি ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। টাকার অভাবে ঠিক করতে পারি না। তাই বস্তিতে থাকি। মাদারীপুরে নিজ বাড়িতে একটি ঘরের জন্য থাকতে পারছি না। ঘর হারিয়ে ঢাকার বস্তিতে আসার পর আমার একমাত্র ছেলেটাকেও হারিয়েছি। সে বুড়িগঙ্গায় ডুবে মারা গেছে। এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না। বর্তমানে আমি পাঁচ মাসের গর্ভবতী। কয়েক মাস পরে সন্তান জন্ম হবে। তাই আমার ঘরটি যদি কেউ ঠিক করে দিত, তাহলে আমি স্বামী-সন্তান নিয়ে নিজ ঘরে নিরাপদে থাকতে পারতাম।

আরও পড়ুন

বৃত্তি পেয়েও ছাবিদের মুখে হাসি নেই, কাঁদছে পরিবার

মাদারীপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আফজাল হোসাইন বলেন, তারা দুইজনেই প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তাছাড়া ক্যানসার আক্রান্ত দেলোয়ার চিকিৎসার জন্য সমাজসেবায় একটি দরখাস্ত দিয়েছেন। তা যাচাই করা হয়েছে। ঘটনা ঠিক আছে, তাই শিগগিরই তাকে চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে অনুদানের টাকা দেওয়া হবে। তবে তার ঘর যদি নদীভাঙনের শিকার হতো, তাহলে সমাজসেবা থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করা যেত।

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এফএ/এএসএম