ফরিদপুরের সালথায় ড্রেজার (মাটি-বালু কাটা যন্ত্র) মালিকের কাছ থেকে চাহিদামতো ঘুসের টাকা না পেয়ে ড্রেজারের পাইপ ভাংচুর করার অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদের বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদকে নিজ হাতে হাতুড়ি দিয়ে ড্রেজারের পাইপগুলো ভাংচুর করতে দেখা যায়। এ ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া গ্রামের শহিদুল মোল্লার ছেলে জয়দার মোল্লা (২৭) একজন ড্রেজার মালিক। গত জুলাইয়ের শুরুতে বড় বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইমামুল হাসান নামে এক ব্যক্তি কেনা মাটি তিনি ড্রেজার দিয়ে কাটার কাজ শুরু করেন।

ড্রেজার মালিক জয়দার মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটা শুরুর ২/৩ দিন পর এএসপি নিষেধ করেন। বিষয়টি ইমামুল ও তার ভাই কবিরকে জানানো হয়। এর দুদিন পর কবির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে এএসপির কার্যালয় নগরকান্দায় দেখা করি। পরদিন আমি একা যাই এবং নিজ হাতে তাকে ছয় হাজার টাকা দেই। তখন তিনি তার ভিজিটিং কার্ড দেন। এ সময় ওই স্থান ছাড়াও অন্য কোথাও মাটি-বালু তুললে তা জানানোর কথা বলেন।

জয়দার মোল্লা বলেন, সে অনুযায়ী আমার কাজ চলছিল। বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে এএসপি মোবাইলে কল করে দেখা করতে বলেন। তখন আমার ভাগ্নির অসুস্থতার কথা বলে পরে দেখা করার কথা বলি। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে আবারও কল করেন এবং আমি বলি এক ঘণ্টার মধ্যে আসতেছি। তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আসা লাগবে না। আমি নিজেই সাইটে আসতেছি। পরে তিনি আরও পুলিশ সদস্য নিয়ে এসে আমার ড্রেজারের পাইপ ভাংচুর করেন। পরে আমি কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তিনি দুই দফায় আমার ড্রেজারের পাইপ ভাংচুর করেছেন। আমার জানামতে মাটি-বালু কাটা সংক্রান্ত বিষয় ইউএনও, এসিল্যান্ড অফিস দেখেন। কিন্তু এএসপি কেন নাক গলাচ্ছেন।

ড্রেজার মালিক জয়দার মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, তিনি দেখা করতে বলেছিলেন, কিন্তু কাছে টাকা না থাকায় সময়মতো দেখা করতে পারিনি। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ড্রেজারের পাইপ ভাংচুর করেছেন।

ইমামুল হাসানের ভাই কবির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমরা চাচার জমি থেকে মাটি কিনে তা কাটার জন্য ড্রেজার মালিক জয়দার সঙ্গে চুক্তি করি। পরে এএসপি জমির মালিককে মাটি কাটতে বাধা দিলে আমার ভাই এএসপির সঙ্গে কথা বলে দেন। পরে আমরা দুজন নগরকান্দা সার্কেল অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। একদিন পরে ড্রেজার মালিক জয়দার মোল্লা আবারও একা তার সঙ্গে দেখা করেন। এএসপি নিজে এসে ড্রেজারের পাইপ ভাংচুর করেছে এটা সঠিক। তবে তাদের মধ্যে আলাদা কি কথা হয়েছে তা জানা নেই। এছাড়া টাকা লেনদেনের সময় উপস্থিত ছিলাম না। তবে বিষয়টি শুনেছি।

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদ জাগো নিউজকে বলেন, দুজন সাংবাদিক খবর দিয়ে বল্লো যে, আমার নাম ভাঙ্গিয়ে বলতেছে যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতেছে। তো ওইখানে অভিযান পরিচালনা করলাম গেলাম। ওদের পাইনি। বালু অবৈধভাবেই কাটতেছে সেগুলো ভেঙ্গে দিয়েছি।

মাটিকাটা-বালুকাটার বিষয়টি এসিল্যান্ড, ইউএনওর দেখার এখতিয়ার, উনাদের জানিয়ে করলে ভালো হতো কি না? উনারাকি কি বিষয়টি জানেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জানালে ভালো হতো। আমি ইউএনওর সঙ্গে কথা বলছি।

ড্রেজার মালিকের সঙ্গে লেনদেন এবং পরবর্তীতে দেখা করার কথা ছিল কিন্তু ড্রেজার মালিক দেখা করেননি এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ভাংচুর করেছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন এ ধরনের বক্তব্য দিলে তো আর আমার কিছু করার নেই। আপনারা তদন্ত করেন।

টোকেন হিসেবে ভিজিটিং কার্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, এখন যদি সে বলে আমার কি করার আছে। ড্রেজার মালিকের কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয়ে আমার সংশ্লিষ্ট নেই, তাকে চিনিও না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানা নেই। আপনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) সঙ্গে কথা বলেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. শামছুল আজম জাগো নিউজকে বলেন, আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। এটা বিস্তারিত না জেনে এ মুহূর্তে মন্তব্য করতে পারছি না।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, কৃষি জমির টপ সয়েল বিক্রি করা ভূমি অধিকার আইনে নিষিদ্ধ ও অপরাধ। জমির শ্রেণী পরিবর্তন করতে জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি ছাড়া কাজ করলে অন্যায়। এসব আমাদের নজরে আসলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। এখন পুলিশ কিভাবে করছে আমি জানি না।

আপনাদের জানানোর বাইরে শুধুমাত্র পুলিশ পোশাক ছাড়া এ ধরনের অভিযান এবং যন্ত্রপাতি বিনষ্ট করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নে ইউএনও বলেন, নষ্ট করার ক্ষমতা কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটেরও নেই। যেটা পরিবেশে জন্য ক্ষতিকর সেটা নষ্ট করা যেতে পারে। তবে মেশিন পুড়িয়ে দেওয়া, পাইপ ভেঙ্গে দেওয়া এগুলো অবৈধ। সরকার যদি মনে করে এ পাইপটা অন্যায় কাজে ব্যাবহার হচ্ছে তাহলে ম্যজিস্ট্রেট তা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে, কিন্তু ধংস করবে না।

এন কে বি নয়ন/এএইচ