জামালপুরের ইসলামপুরে ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেটের খরচের প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়প্রতি বাৎসরিক বরাদ্দের ১০ হাজার ৫০০ টাকা প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার পর তা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকেরা।
অভিযোগ ওঠার পর গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পূর্ব ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেতাদের ডেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের দাবি, বৈঠকে বিষয়টির সমাধান হয়েছে। তবে বৈঠকে উপস্থিত কোনো শিক্ষক এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট খরচ বাবদ বিদ্যালয়প্রতি ১২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ আসে। আয়কর ও ভ্যাট বাদ দিয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে দেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষকেরা গত জুন মাসে ব্যাংক থেকে ওই টাকা উত্তোলন করেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, জুলাই মাসে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট গুচ্ছের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত নেন। কিন্তু পরে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের কাছে রেখে দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষুব্ধ শিক্ষকেরা বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করেন। এ নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবুর কাছেও বিচার দাবি করেন তাঁরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৮ থেকে ২০টিতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোতে সংযোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকেরা।
মরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন্নাহার বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ গত জুন মাসে আমাদের ১০ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। জুলাই মাসে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ সরকার রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার কথা বলে গুচ্ছের সব প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরত নিয়েছেন।’
পূর্বকান্দারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতি মাসে বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট বাবদ প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হয়। গত জুনের শেষ দিকে ইন্টারনেট খরচ বাবদ বাৎসরিক ১০ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১১ জুলাই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার কথা বলে সেই টাকা ফেরত নিয়েছেন।’
ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন, আলাই পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন এবং ধনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাইনুল হক বলেন, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা দীপা রানী গোপ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে ফেরত নিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের ইসলামপুর উপজেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ মাসুদুর রহমান রাজা বলেন, ‘২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯৬টি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট খরচ বাবদ ১২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ আসে। আয়কর ও ভ্যাট বাদে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে শিক্ষকদের দেওয়া টাকা গত জুলাই মাসে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ফেরত নেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন।’
মাসুদুর রহমান আরও বলেন, ‘আইএসপি নামে একটি বেসরকারি সংস্থাকে ইন্টারনেট সংযোগের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখনো ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়নি।’
তবে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা দীপা রানী গোপ ও আব্দুল হামিদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এতে শিক্ষা কর্মকর্তাদের দোষ নেই। বরং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল।
ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া প্রতিষ্ঠান আইএসপির এ উপজেলায় তদারকির দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তারা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেনি। মূলত ইন্টারনেট সংযোগ ও বিল নিয়ে আমাদের সঙ্গে শিক্ষকদের মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। সবগুলো বিদ্যালয়ে একসঙ্গে সংযোগ না দেওয়ায় শিক্ষকেরা আমাদের একই হারে বিল পরিশোধ করতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সমঝোতা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা ফেরত নিইনি। বরং টাকা উত্তোলনের পর শিক্ষকেরাই কোনো এক শিক্ষকের কাছে জমা রেখে সুযোগমতো ইন্টারনেটের বিল পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন।’
অভিযোগের সত্যতা না থাকলে শিক্ষকদের ডেকে বৈঠকে বসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকেরাই আমাদের ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা সেখানে কোনো কথা বলিনি। শিক্ষকেরাই ইন্টারনেট বিতরণকারীদের সঙ্গে বিষয়টি সমাধান করেছেন।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন বলেন, ‘টাকা আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মূলত ইন্টারনেট বিতরণকারীদের সঙ্গে শিক্ষকদের ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল। গতকাল বিষয়টি সমাধান হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের হাতে টাকা দেওয়া হয়েছে।’
জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আহসান বলেন, ‘সরকারি টাকা তছরুপসহ অফিস কর্মকর্তাদের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’








