দেশের শহর থেকে গ্রাম, অভিজাত এলাকা থেকে সাধারণ পরিবার, সর্বত্রই গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়। কখনো খাবার চুরি বা কাজের ভুলের অজুহাতে, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে আসা গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাগুলো একেকটি বিভীষিকাময় গল্প। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আলোচিত এসব ঘটনার অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখ দেখে না। মামলা হয়, গ্রেফতার হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে, এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার অধিকাংশই বাইরের পৃথিবী জানতে পারে না। গৃহ শ্রমিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, গৃহকর্মীদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের নারী ও শিশু। নির্যাতনের শিকার হলেও তাদের পরিবারের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক চাপে মীমাংসার পথ বেছে নেন অনেকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গৃহকর্মী নির্যাতনের একাধিক আলোচিত ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিল্পপতি থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের পরিচিত মুখও। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গ্রেফতারের পর আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে।
সম্প্রতি শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে করা একটি মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান ২৮ এপ্রিল জামিন পেয়েছেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তার বাসায় কাজ করা ১১ বছর বয়সি এক শিশুর শরীরে নির্যাতনের অসংখ্য চিহ্ন পাওয়া যায়। গরম খুন্তির ছ্যাঁকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের দাগ ছিল। এর আগে রাজধানীতে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সিমন হাসান একা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পান। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনায় শুরুতে তৎপরতা দেখা গেলেও পরে মামলার গতি কমে যায়। ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারার একটি আবাসিক এলাকায় ১৩ বছর বয়সি গৃহকর্মী কল্পনাকে নির্যাতনের ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। মামলার নথি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। চুল শুকানোর ড্রায়ার দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, নখ তুলে ফেলা, জুতার ব্রাশ দিয়ে আঘাত করা এবং মারধরে দাঁত ভেঙে দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠে আসে। তদন্ত চলাকালে উভয়পক্ষের মধ্যে আপসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আদালতে আপসনামাও জমা দেওয়া হয়। তবে আদালত সেটি গ্রহণ না করে বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বর্তমানে মামলার বিচার চলছে। এ মামলার অভিযুক্ত বাসার মালিক দিনাত জাহান আদর ও তার ভাই নাজমুস সাকিব জামিনে রয়েছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের দাবি, এ ধরনের মামলায় আপসের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক প্রলোভন, সামাজিক চাপ কিংবা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার আপস করতে বাধ্য হয়।
গৃহকর্মী নির্যাতনের ৬৫ শতাংশ ঘটনাই আড়ালে থেকে যায় : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪০ জন। এর মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় গিয়েছে মাত্র ৫০টি ঘটনা। অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনাই আদালত কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে পৌঁছায় না।
সংস্থাটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বাসার ভেতর। ভুক্তভোগীরা সাধারণত দরিদ্র পরিবারের সদস্য হওয়ায় অভিযোগ জানাতেও ভয় পান। অনেক পরিবার কাজ হারানোর আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখে। এছাড়া গত ছয় বছরে নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মীদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ছিল ৬ বছরের নিচে। অর্থাৎ সবচেয়ে অসহায় শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত ১৫ বছরে ৩৫০ গৃহকর্মী নিহত : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ৭১৪ জন গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৪৫ জন। আত্মহত্যা করেছেন ১৭ জন এবং নিখোঁজ হয়েছেন দুজন।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, বিচার পাওয়ার বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আস্থার সংকট রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন না যে শেষ পর্যন্ত তারা ন্যায়বিচার পাবেন। ফলে মামলা শুরু হলেও পরে অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক চাপে মীমাংসার পথ বেছে নেন। এজন্য এসব ঘটনায় পুলিশের বাদী হওয়া প্রয়োজন।
কেন বিচার হয় না : গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী আবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটলেও দণ্ডের নজির খুবই কম। তার মতে, দুর্বল এজাহার, প্রভাবশালী আসামি, দীর্ঘ তদন্ত এবং সাক্ষী সংকট বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রধান কারণ।
মানবাধিকারকর্মী সালমা আলী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হলেও পরবর্তীকালে অধিকাংশ মামলার গতি কমে যায়। সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই আদালতে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হন না। অন্যদিকে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে ধীরগতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীদের হতাশ করে। ফলে অনেক পরিবার মাঝপথে আপস করে নেয়। এতে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হয় না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গৃহকর্মীদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো, দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।








