গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আজ বৃহস্পতিবার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে এ-সংক্রান্ত নতুন আইন করতে একটি বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্য আরেকটি বিল আনা হয়েছে।
সংসদে আজ বৃহস্পতিবার আলাদাভাবে বিল তিনটি তোলা হয়। পরে বিলগুলো পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন পর্ব থেকে বিরোধীদলীয় সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
সংসদে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি নিয়ে কথা বলেন। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ার কঠোর সমালোচনা করেন। পরে তিনি আজ উত্থাপনের জন্য নির্ধারিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন পর্বে অংশ নেবেন না উল্লেখ করে ওয়াককাউট করেন।
বিরোধীদলীয় সদস্যরা রাত ৮টা ৬ মিনিটে ওয়াকআউট করেন। পরে তাঁরা গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে বিলটি পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিলে বলা হয়, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুম একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিল পাস হলে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।
গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী (যেমন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব বা যেকোনো যৌথ বাহিনী) নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করে কিংবা তার অবস্থান গোপন রাখে, তবে তা গুম বলে গণ্য হবে।
গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বিলে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাঁদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়া, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। গুমের অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বরাবরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
বিলে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। গুমের মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করবে।
বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালত গুমের অপরাধের বিচার করবেন। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে দাখিলকৃত অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচার্য, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে।
মানবাধিকার কমিশন আইন করতে বিল: ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করতে সংসদে বিল উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে বিলটি দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে এই কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। এখন যে আইন করা হচ্ছে, সেখানেও কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বিদ্যমান আইনের তুলনায় বিস্তৃত করা হচ্ছে।
বিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ দিতে একটি বাছাই কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। কমিটিতে থাকবেন স্পিকার (সভাপতি), আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি, নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি।
বিলে শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি শিরোনামে আলাদা একটি ধারা আছে। এ ধরনের ধারা ২০০৯ সালের আইনেও আছে। বিলে বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এ প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। এ রকম সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তার গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে অবহিত করবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনে বিল: ১৮৮২ সালের দ্যা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট সংশোধনে বিলটি আনেন আইনমন্ত্রী। পরে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিলে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ কর্তৃক তাঁর সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (অথবা বিপরীতক্রমে) অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভোগাধিকার থাকবে এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।








