হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও প্রাচীন মিশরের ইতিহাস আজও বিশ্বের মানুষের কাছে সমান আকর্ষণীয়। নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এবং আধুনিক জাদুঘর নির্মাণের মাধ্যমে মিসরের প্রাচীন সভ্যতা যেন বারবার ফিরে আসছে আলোচনায়। পিরামিড, মন্দির, সমাধি আর প্রাচীন নিদর্শনে ভরপুর দেশটি ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।

নিচে তুলে ধরা হলো প্রাচীন মিসরের অন্যতম সেরা দর্শনীয় স্থানগুলো—

১. ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম

কায়রোর তাহরির স্কয়ারে অবস্থিত এই জাদুঘরে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রাচীন মিসরীয় নিদর্শনের সংগ্রহ। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে হাজার হাজার প্রত্নবস্তু, যার মধ্যে বিখ্যাত রাজা তুতানখামেনের ধনসম্পদ এবং মমির কক্ষ সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আকর্ষণ করে। ভবিষ্যতে এসব নিদর্শন ধীরে ধীরে গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

২. গিজার পিরামিড

বিশ্বের সাত আশ্চর্যের অন্যতম গিজার তিনটি পিরামিড প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। সবচেয়ে বড় পিরামিড ‘গ্রেট পিরামিড অব খুফু’ প্রায় ২৩ লাখ পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি। দর্শনার্থীরা পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন এবং উটে চড়ে পিরামিডের সামনে ছবি তুলতে পারেন।

৩. গ্রেট স্ফিংক্স

গিজার পিরামিডের পাশে অবস্থিত সিংহের দেহ ও মানুষের মাথাবিশিষ্ট বিশাল এই ভাস্কর্যটি প্রাচীন মিসরের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। প্রায় ২৪০ ফুট দীর্ঘ এই স্ফিংক্স খ্রিস্টপূর্ব ২৬ শতকে নির্মিত হয়েছিল।

৪. সাক্কারার স্টেপ পিরামিড

কায়রোর দক্ষিণে অবস্থিত এই পিরামিডকে বিশ্বের প্রথম প্রকৃত পিরামিড হিসেবে ধরা হয়। ফারাও জোসেরের জন্য এটি নির্মাণ করেছিলেন স্থপতি ইমহোটেপ। পরবর্তীতে মিসরের বিখ্যাত পিরামিড নির্মাণের পথ দেখিয়েছিল এই স্থাপনা।

৫. আলেকজান্দ্রিয়া

প্রাচীন বিশ্বের বিখ্যাত বাতিঘর এখন আর নেই, তবে গ্রিক ও রোমান যুগের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনো রয়েছে এই শহরে। ক্যাটাকম্বস অব কোম এল শোকাফা, পম্পেইস পিলার এবং আধুনিক বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিনা দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।

৬. ভ্যালি অব দ্য কিংস

নাইল নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই উপত্যকায় মিশরের বহু ফারাওকে সমাহিত করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ৬৩টি সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে। তুতানখামেন, রামেসিস চতুর্থ এবং থুতমোসিস তৃতীয়ের সমাধি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত।

৭. কারনাক মন্দির

মিশরের সবচেয়ে বড় প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স এটি। বিশাল স্তম্ভ, স্ফিংক্সের সারি এবং অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর কারণে এটি দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক স্থান। রাতে এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোও আয়োজন করা হয়।

৮. লুক্সর মন্দির

নাইল নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি কারনাকের তুলনায় ছোট হলেও সমান আকর্ষণীয়। অনেক গবেষকের মতে, এখানেই প্রাচীন ফারাওদের অভিষেক অনুষ্ঠিত হতো। রাতের আলোয় মন্দিরটি আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

৯. হাটশেপসুট মন্দির

রানি হাটশেপসুটের স্মরণে নির্মিত এই মন্দিরের নকশা অন্য সব মন্দির থেকে আলাদা। বিশাল পাহাড়ের পাদদেশে তিন ধাপবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি প্রাচীন মিশরের অন্যতম অনন্য স্থাপত্য।

১০. আবু সিম্বেল

ফারাও রামেসিস দ্বিতীয়ের নির্মিত এই বিশাল মন্দির একসময় বালুর নিচে চাপা পড়ে ছিল। পরে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের সময় পুরো মন্দিরটি স্থানান্তর করা হয়। বছরে দু'বার সূর্যের আলো মন্দিরের ভেতরের দেবমূর্তির ওপর সরাসরি পড়ে, যা পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।

১১. ফিলাই মন্দির কমপ্লেক্স

দেবী আইসিসকে উৎসর্গ করে নির্মিত এই মন্দির একসময় দ্বীপে অবস্থিত ছিল। আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের সময় এটিও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। ছোট নৌকায় করেই এখানে পৌঁছাতে হয়।

১২. সিওয়া মরূদ্যান

সাহারা মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত এই মরূদ্যান ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এখানে এসে দেবতা আমুনের ওরাকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

১৩. টেল এল-আমার্না

ফারাও আখেনাতেন প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন রাজধানী শহরের ধ্বংসাবশেষ এটি। রানী নেফারতিতি ও তুতানখামেনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই প্রত্নস্থলটি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র।

১৪. রামেসিয়াম

রামেসিস দ্বিতীয়ের স্মৃতিতে নির্মিত এই বিশাল মন্দিরটি ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলির বিখ্যাত কবিতা ‘ওজিমান্ডিয়াস’-এর জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানে বিশাল ভাঙা মূর্তি ও প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন দেখা যায়।

নতুন আকর্ষণ: গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম

গিজার পিরামিডের কাছে নির্মিত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক সভ্যতাভিত্তিক জাদুঘর গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম। এখানে এক লাখেরও বেশি প্রত্নবস্তু প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে তুতানখামেনের সমাধি থেকে পাওয়া সব নিদর্শনই থাকবে। জাদুঘরটি পুরোপুরি চালু হলে এটি হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।

সূত্র: সিএনএন

এমএসএম