বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মহরণ। একদিকে সাম্বার ছন্দ, অন্যদিকে নরওয়ের বরফশীতল আক্রমণ। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের যুদ্ধটা জমে উঠেছে এক চিরন্তন প্রশ্নকে ঘিরে। সেটা হচ্ছে, কীভাবে থামানো হবে এরলিং হালান্ডকে? ব্রাজিল শিবিরের অন্দরমহলে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় এটাই।

ফুটবলপ্রেমীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে, নরওয়ের এই গোল মেশিনের আসল লড়াইটা কার সাথে? গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের মতো শক্তপোক্ত সেন্টার ব্যাকের সাথে, নাকি ব্রাজিলের আক্রমণের প্রাণভোমরা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সাথে? তবে একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, হালান্ডকে হারানোর আসল দাবার চালটি কিন্তু খেলবেন ব্রাজিলের মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

নরওয়ের এই দানবীয় ফরোয়ার্ডকে বোতলবন্দি করতে ব্রাজিল বস ঠিক কী ধরনের রণকৌশল সাজাচ্ছেন, চলুন দেখে নেওয়া যাক:

আলাদা কোনো 'অ্যান্টি-হালান্ড' মিশন নেই ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এসে কার্লো আনচেলত্তি শুরুতেই যেন এক মনস্তাত্ত্বিক চাল চাললেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, হালান্ডকে থামানোর জন্য আলাদা করে কোনো ‘অ্যান্টি-হালান্ড’ পরিকল্পনা তাঁর ডায়েরিতে নেই। নিজের ডিফেন্ডারদের ওপর অগাধ আস্থা কোচের। তাঁর মতে, সেলেসাও ডিফেন্ডারদের নতুন করে কিছু শেখানোর প্রয়োজন নেই, কারণ ক্লাব ফুটবলে এই নরওয়েজিয়ানের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের আগেই হয়েছে।

পাস সরবরাহের পথ বন্ধ করা হালান্ডকে আটকানোর মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তাঁর কাছে বল পৌঁছানোর পথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার মাঝে। আনচেলত্তির মূল মন্ত্র হলো, হালান্ডকে সরাসরি ট্যাকল করার চেয়ে তাঁর সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়া বেশি কার্যকর। নরওয়ের মিডফিল্ড এবং উইং থেকে আসা পাসগুলো যদি মাঝপথেই আটকে দেওয়া যায়, তবে দলটির চেনা বিল্ডআপ ধসে পড়বে। হালান্ড জাত ফিনিশার হতে পারেন, কিন্তু বল না পেলে মাঠে তিনি কেবলই একজন দর্শক।

যৌথ রক্ষণাত্মক দেয়াল গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস এবং মারকিনিয়োস নামের দুই অভিজ্ঞ সেন্টার ব্যাককে হয়তো মূল দায়িত্বটা সামলাতে হবে, তবে আনচেলত্তির পরিকল্পনা একক কোনো দ্বৈরথের নয়। পুরো ব্রাজিল দল মাঠে নামবে একটি কমপ্যাক্ট ডিফেন্সিভ ইউনিট হিসেবে। লক্ষ্য একটাই, হালান্ড যেন বক্সে সামান্যতম ফাঁকা জায়গা বা ঘুরে দাঁড়িয়ে শট নেওয়ার সুযোগ না পান।

সতর্ক চোখ, তবে অতিরিক্ত মনোযোগ নয় ব্রাজিল কোচের সবচেয়ে বড় দূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর একটি কথায়, ‘বিপদকে চেনো, কিন্তু অতিরিক্ত মগ্ন হইয়ো না।’ আনচেলত্তি খুব ভালো করেই জানেন, নরওয়ে মানে কেবল হালান্ড একাই নন, তারা দলগতভাবে বেশ গোছানো। তাই ব্রাজিলের মূল লক্ষ্য থাকবে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। শুধু একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে যে খেসারত দিতে হতে পারে, সেই বাস্তবতাবোধ ব্রাজিল বসের আছে।

এর বাইরেও ব্রাজিলের কৌশলের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকবে প্রতিপক্ষের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাক রুখে দেওয়া এবং ফাউল কিংবা সেট-পিস থেকে তৈরি হওয়া সুযোগগুলো নসাৎ করা। কারণ ট্রানজিশনের সময় এবং ডি-বক্সের ভেতর ওয়ান-টাচ ফিনিশিংয়ে হালান্ড অবিশ্বাস্য রকমের বিপজ্জনক।

দলের এই রণকৌশল নিয়ে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারেসও তাঁর আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হ্যারি কেইনের পাশাপাশি হালান্ড এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড। তাই আমাদের প্রথম কাজ হবে তাঁর কাছে বলের জোগান বন্ধ করা। আমরা অবশ্যই তাঁকে কড়া মার্কিংয়ে রাখব, কারণ ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে তাঁর জন্য মাত্র একটা সুযোগই যথেষ্ট।’

সব মিলিয়ে সেলেসাওদের পরিকল্পনা এখন কাচের মতো পরিষ্কার। হালান্ডকে রুখতে গিয়ে নিজেদের ছন্দ হারানো নয়, বরং নরওয়ের আক্রমণভাগকে এমনভাবে অকার্যকর করে দেওয়া যাতে এই গোল মেশিন মাঠে থেকেও কার্যত অদৃশ্য হয়ে যান। এখন দেখার বিষয়, আনচেলত্তির এই মগজাস্ত্র ভেদ করে হালান্ড ঝড় তুলতে পারেন, নাকি সাম্বার ছন্দের কাছে নতিস্বীকার করে নরওয়ে।