চারদিকে শুধু পানি আর পানি, এরই মাঝে এক ফোঁটা কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে মাঝ হাওরে ট্রলারের নোংরা মেঝেতে নিভে গেলো এক নিষ্পাপ নবজাতকের জীবনপ্রদীপ। পৃথিবীর আলো দেখার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় চিরবিদায় নিলো সে। সামনে এলো হাওরাঞ্চলের এক কঙ্কালসার চিকিৎসাব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা।
বর্ষার থইথই জলরাশির বুকে যখন উত্তাল ঢেউ ওঠে, দূর থেকে তা দেখতে চোখজুড়ানো মনে হতে পারে। কিন্তু এই চোখজুড়ানো সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে হাওরবাসীর এক নির্মম জীবন-মরণের সংগ্রামের গল্প। প্রথম সন্তানকে বাঁচাতে এক বাবার মরণপণ লড়াইয়ের গল্প।
হতভাগা ওই প্রসূতির নাম স্বপ্না আক্তার (২০)। তিনি পূর্ব অষ্টগ্রামের হাবলীপাড়ার বাসিন্দা। পেশায় স্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ী আয়তুল ইসলাম ইদুর (২৪) স্ত্রী তিনি। গত শুক্রবার (২৬ জুন) ভোর ৪টায় স্বপ্নার প্রসব বেদনা উঠলে শুরু হয় এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। বেলা ১১টা পর্যন্ত স্থানীয় দাই ও গ্রাম্য ডাক্তার দিয়ে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হতে থাকলে প্রথম সন্তান আর স্ত্রীকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন বাবা আয়তুল ইসলাম ইদু। লক্ষ্য- ভাগলপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
আরও পড়ুন
হাওরে কৃষকের যন্ত্রণা ‘অপরিকল্পিত বাঁধ’
কিন্তু ঘরের কাছে ‘অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’ থাকতেও কেন সেখানে গেলেন না? এক বুক হাহাকার নিয়ে বাবা ইদু বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাইনি, কারণ বড় ভয় ছিল- ওখানে নিয়ে গেলে যদি ডাক্তাররা আবার রেফার করে দেয়, তখন শুধু শুধুই সময় নষ্ট হবে। আমাদের সরকারি হাসপাতালের ওপর ভরসা করার সাহস ছিল না।’
ট্রলারের ভেতর পলিথিনের আড়াল
শুকনো মৌসুমে যে পথ পাড়ি দিতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে, বর্ষার এই দিনে ঘাট আর ট্রলার খুঁজতেই তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময়। কোনো স্পিডবোট বা দ্রুতগতির সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স মেলেনি। অবশেষে দেওঘর ঘাট থেকে একটি সাধারণ ট্রলারে প্রসূতিকে নিয়ে রওনা হন স্বজনরা। হুমায়পুর থেকে পাটুলীঘাট যাওয়ার পথেই মাঝ-হাওরে স্বপ্নার তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয়।
আরও পড়ুন
ভেজা ধানেই খোরাকির খোঁজ
সেই নৌকায় অসুস্থ মাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন হুমায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর হারিস মিয়া (৩৬)।

তিনি সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘নৌকায় কোনো পর্দা ছিল না। ছটফট করছিল এক মা। আমি নিজে মাঝির কাছ থেকে বৃষ্টির নোংরা পলিথিন চেয়ে নিয়ে কোনো রকমে একটা আড়াল তৈরি করি। সেই পলিথিনের আড়ালে ট্রলারের কাঠের মেঝেতেই জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। জন্মের পর প্রথম কয়েক মিনিট বাচ্চাটি ভালোই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।’
আরও পড়ুন
হাওরে হাসির বদলে কান্নার ঈদ
চলন্ত ট্রলারে তীব্র বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জন, কিন্তু সেখানে ছিল না কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার। হারিস মিয়া বলেন, ‘বাচ্চাটিকে আমি কোলেও নিয়েছিলাম। ছটফট করতে করতে চোখের সামনেই মাত্র ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে নবজাতকটি শান্ত হয়ে গেলো। একটু অক্সিজেন দিতে পারলে বাচ্চাটা বেঁচে যেত! সন্তানহারা বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না। চিকিৎসার শেষ চেষ্টা করতে নিজের অসুস্থ মাকে ঘাটে ফেলে রেখে নবজাতক আর মাকে নিয়ে বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ডাক্তার জানান, হাসপাতালে আনার আগেই বাচ্চাটি মারা গেছে।’
বড় বড় রাস্তা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়েনি
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তিতুমীর হোসেন সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নৌকায় প্রসব এবং একটু পরেই বাচ্চার মৃত্যুর এই হৃদয়বিদারক ঘটনাই বলে দেয় আমাদের হাওরের স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা পাতালে নেমেছে। বিগত সরকারের আমলে হাওরে বড় বড় রাস্তা হয়েছে, বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে, কিন্তু বড় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবার মান বিন্দুমাত্র উন্নত হয়নি। এখনো হাওরের হাসপাতালে কোনো ডাক্তার এলে তারা থাকতে চায় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কোনো ভালো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই- বিল্ডিং বা রাস্তার চোখধাঁধানো উন্নয়নের ফাঁপা বুলি বাদ দিয়ে, আমাদের হাওরের মানুষের চিকিৎসাসেবার দিকে নজর দিন এবং সেবার মান উন্নত করতে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’
আরও পড়ুন
বিলীনের পথে অলওয়েদার সড়ক, দায় এড়াতে ব্যস্ত এলজিইডি-পাউবো
হাওরের সন্তান কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, ‘হাওরবাসীর জীবনের যেন কোনো মূল্যই নেই। স্বাধীনতার এত বছর পরও শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত। আজও একটি উন্নত হাসপাতালের অভাবে গুরুতর রোগীকে ভাগলপুর, ভৈরব কিংবা কিশোরগঞ্জ শহরে ছুটতে হয়। এই বাস্তবতা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।’
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও হাসপাতালের অসহায় আত্মসমর্পণ
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ্ মো. মহিবুল্লাহ্ ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পেরেছেন বলে জানান। তিনি প্রথাগত দায় চাপানোর সুরে বলেন, ‘রোগীকে প্রথমে হাসপাতালে আনা হয়নি, দাইরা জটিলতা তৈরি করেছে।’
আরও পড়ুন
বজ্রপাত-জোঁকের ভয়ে মিলছে না শ্রমিক, ধান নিয়ে দিশাহারা কৃষক
তবে একইসঙ্গে তিনি হাসপাতালের কঙ্কালসার বাস্তবতার কথাও স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের ওটি বা সিজারিয়ান সেকশনের ব্যবস্থা থাকলেও গাইনি ও অ্যানেস্থেশিয়া- এই দুই পদের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে জরুরি রোগীকে রেফার করার মতো কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও আমাদের নেই। এমনকি হাসপাতালের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিরও এক বছর ধরে কোনো সরকারি ড্রাইভার নেই!’
কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল করিমও হাওরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই অসহায়ত্ব স্বীকার করে বলেন, ‘নৌকায় বাচ্চা প্রসব ও মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বর্তমানে হাওরের তিন উপজেলার কোনোটিতেই সিজারিয়ান ব্যবস্থা চালু নেই মূলত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের কারণে। চিকিৎসকদের পোস্টিং দেওয়া হলেও সবার মাঝেই শহরের দিকে চলে যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। আর হাওরের তিনটি হাসপাতালের কোনোটিতেই কখনোই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ছিল না, এখনও নেই।’
এফএ/এমএস








