‘আমরা তখন জাহাজের ডেকে বসে কাজ করছিলাম। দুপুরে সবাই ভাত খেয়ে কেবিনে চলে গিয়েছিলেন। জাল মেরামতে কাজ করতে হবে বলে আমি যাইনি। কাজ করতে বসার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ হয়। তারপর দেখি আগুন জ্বলছে।’

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মাছ ধরার নৌযানে বিস্ফোরণের পর দগ্ধ ছিদ্দিক আহমেদ (৫০) হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সেদিনকার দুর্ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার পর গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ভর্তি করা হয় তাঁকে। কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা এফভি দেশ নামের যে মাছ ধরার নৌযানে (ফিশিং ভেসেল) বিস্ফোরণ ঘটে তার পাশের জাহাজ এফভি ডিজনিতে ছিলেন তিনি। আগুনে দগ্ধ হয়ে তিনি জ্ঞান হারান।

মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পাশাপাশি শয্যায় শুয়েছিলেন ছিদ্দিকসহ তিন নাবিক। ঘটনার পর তখনো আতঙ্ক কাটেনি তাঁদের। প্রথম আলোকে ছিদ্দিক আহমেদ বলেন, তাঁদের জাহাজ এফভি ডিজনিও একটি ফিশিং ভেসেল। তিনি সেখানে ডুবুরি হিসেবে কাজ করেন। এফভি দেশ ও ডিজনি দুটি নৌযানই একই মালিকের। নৌযান দুটি পাশাপাশি নোঙর করা ছিল। কী ঘটেছিল জানতে চাইলে ছিদ্দিক বলেন, ‘হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমি এক পাশে পড়ে যাই। আগুনের তীব্র আঁচ এসে আমার গায়ে লাগে। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দগ্ধ হই। আমি শুধু আগুনটাই দেখেছি, এরপর আর কিছু মনে নেই।’

চট্টগ্রামের সদরঘাট নৌ থানা সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার বেলা দুইটার দিকে ফিশিং ভেসেল এফভি দেশ কর্ণফুলী নদীর সদরঘাটের সাম্পান ঘাট এলাকায় মুরিং বয়ায় নোঙর করে। পরদিন মঙ্গলবার বেলা পৌনে একটার দিকে নৌযানের ইঞ্জিন কক্ষ থেকে হঠাৎ বিকট শব্দের পর আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনে ছিদ্দিক আহমেদ ছাড়াও দগ্ধ হন ক্যাডেট প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম (২২), নাবিক মো. রুবেল (৩২), শাহ আলম (৪০), নিজাম উদ্দিন (৩৭) ও মো. রাসেল (৩৫)। গতকাল রাতে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান নাবিক রুবেল ও শাহ আলম। প্রকৌশলী আশিকুজ্জামানকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্য তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আজ সকালে অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাঁদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন দগ্ধ নাবিকেরা

গতকাল রাতে চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাশাপাশি তিন শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন নিজাম উদ্দিন, ছিদ্দিক ও রাসেল। তাঁরা তিনজনই এফভি ডিজনি নামে নৌযানে কর্মরত। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাবিক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এফভি দেশ জাহাজে ঠিক কী কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটা আমরা জানি না। আমরা শুধু একটা বিকট আওয়াজ শুনেছি, তারপর দেখি আগুন লেগেছে। এরপর আগুনের তাপ আমাদের গায়ে এসে লাগে।’

প্রত্যক্ষদর্শী ও নাবিকদের তথ্য অনুযায়ী, আশিকুজ্জামান তামিম এবং নাবিক মো. রুবেল ও শাহ আলম এফভি দেশ জাহাজের জেনারেটর রুমে কাজ করছিলেন। নোঙর করা নৌযানটিতে তখন রুটিন কাজ চলছিল। কাজ করার সময় একটি শব্দ হয়। এরপর আগুন ধরে যায়। আগুনে এই তিনজন শতভাগ দগ্ধ হন। নাবিকদের ধারণা, জেনারেটর কক্ষে স্ফুলিঙ্গ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে বিস্তারিত তাঁরাও জানাতে পারেননি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ আজ বুধবার সকালে বলেন, ‘আমাদের এখানে ছয়জনকে আনা হয়েছে। তিনজনকে তাঁরা ঢাকায় নিয়ে গেছে। আমরা রাখতে চেয়েছিলাম আইসিইউতে। বাকি তিনজন এখানে ভর্তি ছিল। আজ তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো সমস্যা হলে ওয়ার্ডে আসতে পারবেন তাঁরা।