মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (পুরো নাম আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক| তিনি সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে, বিশেষ করে বিশ্বনন্দিত এবং বহুল পঠিত ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুলিৎজার এবং নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন| হেমিংওয়ে ছিলেন এমন একজন লেখক, যাকে বিশ্ব বিখ্যাত অনেক কবি এবং লেখকদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘হারানো প্রজন্ম’ (লস্ট জেনারেশন)-এর কথাসাহিত্যিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে|বিশ্বসাহিত্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নাম-যশ এবং বহুল পরিচিতি থাকলেও তাঁর ব্যক্তি জীবনের অলিতে-গলিতে পদচারণা ছিল ছোটো-বড় অনেক ট্র্যাজেডির| আর তাই তাঁকে মানসিক সমস্যার বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই করতে হয়েছে| তবে পরিতাপের বিষয় যে, অবশেষে তিনি সেই মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের আশায় আত্মহননের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং মাত্র একষট্টি বছর বয়সে তাঁর প্রিয় দোনলা বন্দুকের (ডাবল ব্যারেল শটগান) নল মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন| তাঁর আত্মহত্যার পরপরই সমালোচক এবং পাঠকমহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, হেমিংওয়ের আত্মঘাতীর আড়ালে কী রহস্যময় এবং ধ্বংসাত্মক ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’, নাকি অন্য কোনো কারণ, যেমন তাঁর মানসিক অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতা, ছিল?“আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের আত্মহনন ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’, নাকি অন্য কোনো কারণ” মুক্তগদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো লেখকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ উদঘাটন করা এবং কবে, কোথায় ও কীভাবে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন| এছাড়া আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা, মৃত্যুর পরে ঘনিষ্ঠদের অনুভূতি ও মন্তব্য, এবং উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) বিষয় তুলে ধরা হয়েছে| যেহেতু বাংলাদেশি পাঠকের কাছে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে কোনো অপরিচিত নাম নয় এবং তাঁর উপন্যাস, ছোটোগল্প ও অন্যান্য রচনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে, তাই লেখকের ব্যক্তিজীবন বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণও করা হয়নি| তবে প্রাসঙ্গিকভাবে তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে|আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ১৮৯৮ সালে ইলিনয় রাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন| তিনি ছিলেন পিতা-মাতার ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়| তাঁর বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী| তিনি সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং হাই স্কুলের ছাত্র অবস্থায় লেখালেখি শুরু করেন| স্কুল জীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন এবং অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন|মায়ের কড়া শাসনে বড় হয়েছেন হেমিংওয়ে| জানা যায়, তাঁর মায়ের স্বভাব ছিল জেদি এবং একরোখা| তিনি নিজের মনের মতো করে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করতেন| যখন হেমিংওয়ে শিশু ছিলেন, তখন তাঁকে ছোট মেয়ের মতো সাজাতেন| তিনি চাইতেন হেমিংওয়ে তাঁর বড়বোনের মতো মেয়েলী কাপড়চোপড় পড়ুক| জানা যায়, পরবর্তীতে হেমিংওয়ের মায়ের স্বভাব প্রসঙ্গে তাঁর তৃতীয় স্ত্রী, মার্থা জেলহর্ন, বলেছেন যে, মায়ের একগুঁয়েমি স্বভাবের জন্য আর্নেস্টের মধ্যে ˆশশবের ভয়ঙ্কর স্মৃতি জমেছিল| আর এ কারণে নারীদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাস ও প্রচণ্ড ভয় জন্মছিল| এ ছাড়া মার্থা দাবি করেন যে, মায়ের কারণে আর্নেস্টের মধ্যে উপেক্ষিত হওয়া এবং বিশ্বাসঘাতকতার গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছিল|আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবদ্দশায় সাতটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে| এগুলোর মধ্যে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’, ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’, ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ এবং ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ ক্লাসিক উপন্যাস হিসেবে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেছে| উপন্যাস ছাড়াও তাঁর ছয়টি ছোটগল্পের সংকলন এবং দু’টি আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে|এত অল্পসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশ প্রসঙ্গে হেমিংওয়ে একবার লিখেছেন যে, হরিণ শিকার করা, মার্লিন মাছ ধরা, নাৎসি সাবমেরিন ধাওয়া করা, প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করা, মজার আড্ডা ও পানশালায় দীর্ঘ খোশগল্প করার পেছনে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন| যদিও যেসব কাজ তাঁকে লেখালেখি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, তবে তার জন্য তিনি কখনো অনুশোচনা করেননি, এমনকি সময়ের অপচয় মনে করেননি|আত্মহত্যার প্রবণতা: জানা যায়, মৃত্যুর প্রতি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এক অদ্ভুত আকর্ষণ থাকার জন্য তিনি ˆশশব থেকেই বিভিন্ন দুঃসাহসিক কাজ করেছেন, যেমন মাছ ধরা, হরিণ শিকার করা এবং ষাঁড়ের লড়াই দেখা ইত্যাদি| তাঁর এই অদ্ভুত আকর্ষণের কথা তিনি ১৯৫৪ সালে হলিউডের অভিনেত্রী আভা গার্ডনারকে বলেছিলেন, ‘আমি প্রাণি এবং মাছ হত্যা করতে প্রচুর সময় ব্যয় করি, যাতে আমি নিজেকে হত্যা না করি|’ অথচ মাত্র কয়েক বছর পরে তিনি তাঁর কথার বরখেলাপ করেছেন এবং আত্মঘাতী হয়েছেন|এ কথা সত্যি যে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে জীবনের শেষ সময়ে কয়েকবার আত্মহননের চেষ্টা করেছিলেন| তিনি ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে মানসিক এবং শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা করানোর জন্য হাসপাতালে ছিলেন| সেই সময় তিনি বাড়ি থেকে কিছু জরুরি জিনিসপত্র আনার জন্য ঘরে যাওয়ার কথা বলেছিলেন| তাঁকে নার্স, ডাক্তার এবং বন্ধু মিলে নিয়ে গিয়েছিল| তারা তাঁর নিরাপত্তার জন্য সব সময় সঙ্গে থাকত এবং ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করতো| কেননা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভয় এবং আশঙ্কা ছিল যে, তিনি যে কোনো সময় আত্মহত্যার মতো বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারেন|হেমিংওয়ে ঘরের দরজা খুলে সোজা ছুটে যান তাঁর বন্দুক রাখার কক্ষে এবং দ্রুত দোনলা বন্দুকে এক রাউন্ড গুলি ভরেন| বন্ধু দেখতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে তাঁকে শারীরিকভাবে প্রতিহত করেন| সেই যাত্রায় হেমিংওয়ের ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি এবং তিনি বেঁচে যান|আরেকবার হেমিংওয়ে প্লেনে ওঠার আগে ঘূর্ণায়মান প্রপেলারে উঠে হাঁটতে চেষ্টা করেন| বিমান উড্ডয়ন করার সময় তিনি দু’বার ঝাঁপ দিতে চেয়েছেন| কিন্তু বিচক্ষণ পাইলট তৎক্ষণাৎ বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন| সেবারও তিনি মর্মান্তিক মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দিতে পারেননি|কবে, কোথায় ও কীভাবে আত্মহত্যা: আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ব্লেইন কাউন্টির কেচাম শহরে ঘটেছিল এক অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা| সেদিন ছিল ২ জুলাই ১৯৬১ সাল এবং দিনটি ছিল রোববার| অন্যান্য দিনের মতোই সাত-সকালে সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল চারপাশের সবকিছু| কোথাও কোনো বৃষ্টি ছিল না, এমনকী আকাশে কোথাও ধূসর মেঘের আনাগোনা ছিল না, বরং বাতাসের গতি ছিল অন্য সব দিনের মতো শান্ত ও স্বাভাবিক| সেদিনের সেই ঝরঝরে সুন্দর সকালে যে বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম লেখকের জীবন প্রদীপ আচমকা নিভে যাবে, তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না, এমনকী তাঁর চতুর্থ স্ত্রী মেরি, যাকে হেমিংওয়ে ১৯৪৬ সালে বিয়ে করেছিলেন, আগেভাগে কিছুই টের পাননি| উল্লেখ্য, আত্মহত্যার মাত্র দেড় দিন আগে হেমিংওয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন| সেখানে তাঁকে মানসিক অবসাদ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার জন্য চিকিৎসা করা হয়েছিল|কেচাম শহরের সওটোথ পর্বতমালায় হেমিংওয়ের নিজের বাড়ি ছিল| আত্মহত্যার দিন সাত-সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন| স্ত্রী মেরির ঘুম যেন না ভাঙে, তার জন্য তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে গুদাম ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন| সেখানে তাঁর বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র রাখা ছিল| তিনি তাঁর প্রিয় দোনলা বন্দুক বেছে নেন| জানা যায়, সেই বন্দুক দিয়ে তিনি কবুতর শিকার করতে ভালোবাসতেন| বন্দুক নিয়ে তিনি বাড়ির সামনের দিকে যান এবং প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে বন্দুকের নল কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মস্তিষ্ক উড়ে যায়| আর এভাবেই বিশ্ব সাহিত্যের এক উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় এবং ট্রাজেডিপূর্ণ জীবন প্রদীপ নিভে যায়| পরের দিন সকালে হেমিংওয়ের মর্মান্তিক এবং অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল|আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে কেচাম শহরের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে| তাঁর কবর সমতল এবং মাথার দিকে খুবই সাধারণ লম্বা আয়তাকার পাথরের ফলক আছে, যার ওপর তাঁর নাম এবং জন্ম-মৃত্যুর সন-তারিখ লেখা আছে| জানা যায়, যারা সাহিত্য জগতের এই স্বনামধন্য লেখককে শ্রদ্ধা জানাতে এবং দেখার উদ্দেশ্যে তাঁর কবরে যায়| সেখানে তারা মুদ্রা, বিভিন্ন ধরনের চিঠি এবং সুরার বোতল রেখে আসে|আত্মহননের কারণ: আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবন ছিল রোমান্সকর ও দুঃসাহসিক ঘটনায় পরিপূর্ণ এবং লেখক হিসেবে তাঁর বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি ছিল| অথচ তাঁর মৃত্যু হয়েছে মর্মান্তিকভাবে| তাই স্বাভাবিক কারণে গুণমুগ্ধ পাঠক এবং সমালোচকদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, কেন তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন? তবে কি তাঁর আত্মঘাতীর জন্য ধ্বংসাত্মক ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’ দায়ী, নাকি অন্য কোনো কারণ, যেমন মানসিক অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতা?আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আত্মহত্যার সংবাদ শুনে তাঁর এক বন্ধু ভীষণ আশ্চ্যার্যšি^ত হয়ে বলেছিলেন যে, তাঁর (হেমিংওয়ের) মতো কেউ একজন, যাকে অনেক সমালোচক বিংশ শতকের সেরা লেখক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, ছিলেন এমন মানুষ, যার জীবন ও দুঃসাহসিক অভিযানের প্রতি উৎসাহ তাঁর সাহিত্য প্রতিভার সমান, সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন নোবেল ও পুলিৎজার পুরস্কার, তিনি ছিলেন এমন একজন ভাগ্যবান ˆসনিক যার আইডাহো রাজ্যের সটুথ পাহাড়ী এলাকায় বাড়ি ছিল এবং সেখান থেকে তিনি শীতকালে হরিণ শিকারে যেতেন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস ও ভেনিসে ছিল তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট, নৌবিহারে সময় কাটানোর জন্য ছিল প্রমোদতরী, ছিল স্থায়ী দাম্পত্য জীবন... ছিল ভালো বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও অগণিত মুগ্ধ পাঠক| এত কিছু থাকার পরও কেন তাঁকে মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে আত্মহননের মতো বীভৎস কাজ করতে হয়েছে?যেহেতু হেমিংওয়ে মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতার ভিতর এবং দুঃসাহসিক কাজের মাঝে জীবন কাটিয়েছেন, তাই এ ধরনের প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর কখনোই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়| তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ এবং ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে, যেমন আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা, এবং ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’-এর প্রভাব|আত্মঘাতী হওয়ার আগে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং সম্ভবত শারীরিকভাবে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন| জীবনের অন্তিম সময়ে তিনি ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, ত্বকের ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন এবং সমস্ত অসুস্থতা সহ্য করেছেন| এসব রোগ-বালাই তাঁর মন ও শরীরের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলেছিল| তিনি বেশ কয়েকবার গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন, যার কারণে মাথা ব্যথা, মনের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কানের মধ্যে চিন চিন ব্যথা এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়েছিল| জানা যায়, তিনি তাঁর পিতামাতার কাছ থেকে মানসিক অসুস্থতা জেনেটিকভাবে পেয়েছিলেন এবং ˆশশব থেকেই তাঁর মধ্যে ট্রমা ও রাগ ছিল| বাবার মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁর মনের মধ্যে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল এবং তখন থেকে তিনি প্রচুর মদ্যপান করেছেন| বাবার আত্মহত্যার পরে এক বন্ধুকে তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমার জীবন প্রায় পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, আর আমি নিজেরই দোষে অনেক বেশি মদ্যপান করছি|’ হেমিংওয়ের আরও এক ধরনের জটিল সমস্যা ছিল, যার কোনো চিকিৎসা ছিল না| সেই সমস্যার কারণে তাঁর রক্তে অতিরিক্ত লৌহের চাপ ˆতরি করত| তাতে জয়েন্ট এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গে ভীষণ ব্যথা হতো এবং লিভারের সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মানসিক অবসাদ দেখা দিয়েছিল|আত্মহত্যার কয়েক বছর আগে হেমিংওয়ে দু’দিনের মধ্যে দু’বার বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় মারা যাচ্ছিলেন, যার জন্য তাঁর লিভার, স্প্লিন এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল| এ ছাড়া কয়েক জায়গার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙে গিয়েছিল, কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়েছিল, মেরুদণ্ডের হাড় চূর্ণ হয়েছিল, শরীরের প্রায় পুরো অংশ পুড়ে গিয়েছিল এবং মাথার খুলি ফেটে গিয়েছিল| তাঁর মাথার আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, মস্তিষ্কের তরল পদার্থ তাঁর কান দিয়ে বেরিয়ে আসতো| দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি ক্রমাগত ব্যথায় ভুগেছেন এবং ব্যথা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আরও বেশি মদ্যপান করেছেন| জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতেন এবং তাঁকে শক থেরাপি দেওয়া হতো, কিন্তু কোনো চিকিৎসা তাঁকে সুস্থ করতে পারেনি|আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আত্মহননের অন্যতম কারণ হিসেবে প্রচলিত জনশ্রুতি আছে যে, একসময় তিনি না লিখতে পারার অক্ষমতা অনুভব করেছেন| তবে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার পরেও তিনি প্যারিসের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেছিলেন এবং তা শেষ করতে তাঁকে অনেক কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল| তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আগের মতো উৎকর্ষ সাহিত্য তিনি আর লিখতে পারবেন না| এ ছাড়া যখন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি ছোট লেখা দিতে অনুরোধ করেছিল, তখন তিনি শুধু কেঁদেছেন এবং বলেছেন, ‘আমার কলমে আর লেখা আসছে না|’যদিও মৃত্যুর এত বছর পরে নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না, কেন হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন| তবে এ কথা স্পষ্ট যে, আত্মহত্যা করার আগে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল ছিলেন| অন্যদিকে হয়তো তাঁর আত্মঘাতীর জন্য কাকতালীয় ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’ দায়ী|মৃত্যুর পরে ঘনিষ্ঠদের অনুভূতি, মন্তব্য এবং তর্ক-বিতর্ক: আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করার পরে তাঁর ঘনিষ্ঠদের অনুভূতি ও মন্তব্য ছিল মিশ্র| তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল|হেমিংওয়ের মৃত্যুর পর ব্লেইন কাউন্টির শেরিফ প্রাথমিক তদন্তের পরে মন্তব্য করে বলেছিলেন যে, মৃত্যুটা ‘দুর্ঘটনার মতো মনে হচ্ছে|’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘কোনো খারাপ কাজের প্রমাণ নেই|’ এছাড়া লেখকের চতুর্থ স্ত্রী, মেরি হেমিংওয়ে, এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘মিস্টার হেমিংওয়ে আজ সকাল ৭:৩০টায় বন্দুক পরিষ্কার করার সময় দুর্ঘটনাক্রমে বন্দুক বিস্ফোরিত হয়েছে এবং তার কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন|’ তবে পরবর্তীতে মেরি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আত্মহত্যার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ‘না, তিনি নিজেই নিজের মাথায় গুলি করেছেন| আত্মঘাতী হয়েছেন| শুধু তাই| অন্য আর কিছু না|’অন্যদিকে হেমিংওয়ের মৃতদেহ দেখার পরে প্রত্যক্ষদর্শী সবাই মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি (হেমিংওয়ে) তাঁর কাপড়চোপড় রাখার আলমারি থেকে প্রিয় ঢিলা ও লম্বা পোশাক (ড্রেসিং গাউন) বেছে নিয়েছিলেন, যাকে তিনি ‘সম্রাটের ড্রেসিং গাউন’ বলে সম্বোধন করতেন| সেসব প্রত্যক্ষদর্শী সম্ভবত উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সৃষ্টি ক্লিওপেট্রার কথা মনে রেখেছিলেন, ঠিক যেমন ক্লিওপেট্রা তাঁর শরীরে জড়ানোর আগে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘আমাকে আমার ড্রেসিং গাউন দিন এবং আমাকে মুকুট পরান| কেননা আমার মধ্যে অমর আকাঙ্ক্ষা জেগেছে|’আত্মহত্যার চিরকূট: সাহিত্যিক সম্প্রদায়, পাঠক মহল এবং সাধারণ মানুষ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মৃত্যুর পরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে শুরু করে| তখন তাদের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল তিনি কোনো আত্মহত্যার চিরকূট রেখে গিয়েছিলেন কি না| কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি আত্মহননের আগে আত্মীয়-স্বজন কিংবা কাছের মানুষদের জন্য চিরকূট লিখেন| সেসব চিরকূটে তাঁরা তাঁদের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করেন বা প্রিয়জনদের প্রতি বিদায় জানান; কিন্তু আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ক্ষেত্রে এরকম কোনো চিরকূট পাওয়া যায়নি| তাঁর স্ত্রী, মেরি হেমিংওয়ে, আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের নিশ্চিত করেন যে, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর আগে আর্নেস্ট কোনো চিরকূট লিখে যাননি| যদিও আত্মহত্যার চিরকূট না লেখার কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে অনেকে মনে করেন, হেমিংওয়ে নিজেই হয়তো সুইসাইড নোটকে অপ্রয়োজনীয় বা অনুচিত মনে করেছিলেন| নিজের জীবন যতই বিশৃঙ্খল হোক না কেন, তারপরও যদি তিনি জীবনের শেষ সময়ে তাঁর সহজাত লেখনীর মতো প্রকাশ করতে সক্ষম মনে করতেন, তবে হয়তো তিনি তাঁর দুঃখ-কষ্ট এবং মানসিক যন্ত্রণার কথা বলে যেতেন|এ কথা সত্যি যে, আত্মহত্যার চিরকূট না থাকার জন্য শেষ সময়ের আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মানসিক অবস্থা অজানা রয়ে গিয়েছে, যা তর্ক-বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে| অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, তিনি প্রচলিত উপায়ে আত্মহত্যার চিরকূটের মাধ্যমে নিজের মানসিক অবসাদ বা দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করতে পারছিলেন না| কেউ কেউ বলেন, তার অভ্যন্তরের সংঘাতের আবেগগত তীব্রতা হয়তো শেষ মুহূর্তগুলোতে তাঁকে লিখতে বাধা দিচ্ছিল| অন্যদিকে আবার কেউ বলেন, সম্ভবত প্রিয়জনদের অতিরিক্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা করতে তিনি সচেতনভাবে চিরকূট না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন| তাই এসব সম্ভাব্য কারণে হয়তো তিনি আত্মহননের আগে চিরকূট লিখে যাননি|উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি): আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উত্তরাধিকার গভীর এবং বিস্তৃত, যা লেখক ও পাঠক প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলেছে| তাঁর লেখার ধরন, যা সংক্ষিপ্ত এবং সাবলীল প্রবাহের জন্য পরিচিত, মার্কিন কথাসাহিত্যের উঁচু মানদণ্ড হয়ে উঠেছে| হেমিংওয়ের সাহিত্যকর্মে প্রায়ই তাঁর ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ প্রতিফলিত হয়েছে| আর এসবের মধ্যে রয়েছে তাঁর দুঃসাহসিক জীবনধারা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাংবাদিক হিসেবে ভূমিকা| আর্নেস্ট হেমিংওয়েরের গদ্যের ধরন সম্ভবত বিশ শতকের সবচেয়ে ব্যাপকভাবে অনুসরণ করার স্টাইল হিসেবে গণনা করা হয়| তিনি এমন একটি বিশেষ ধারা উদ্ভাবন করেছিলেন, যা আখ্যান কিংবা চরিত্র বর্ণনা করার জন্য সংক্ষিপ্ত এবং সহজ বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে, অর্থাৎ বর্ণনার সময় সব ধরনের মন্তব্য বা আবেগপূর্ণ বাগ্মীতা বাদ দেওয়া হয়েছে| সেসব বাক্যে বেশি করে বিশেষ্য এবং ক্রিয়াপদ রয়েছে, অল্প সংখ্যক বিশেষণ এবং ক্রিয়াবিশেষণ আছে| এসবের প্রভাব প্রধানত পুনরাবৃত্তি ও ছন্দের ওপর নির্ভরশীল| এ কারণে সংক্ষিপ্ত ও ঘন বুনটের গদ্য প্রায়শই অনুরণিত এবং সংযমের মাধ্যমে বিদ্রূপ প্রকাশ করতে সক্ষম| একইভাবে তাঁর সংলাপের ব্যবহারও নতুন, সহজ এবং স্বাভাবিক| তাঁর লেখনীর এই আলাদা স্টাইলের প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঔপন্যাসিকদের রচনায় দেখা গিয়েছে, বিশেষ করে ১৯৩০-এর দশক থেকে ’৫০-এর দশক পর্যন্ত|আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উত্তরাধিকার আজও আত্মহত্যা, সৃজনশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অসংখ্য আলোচনাকে অনুপ্রাণিত করে| অনেক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হেমিংওয়ের জীবন মানুষের অভিজ্ঞতার এক নিগূঢ় সত্যকে তুলে ধরে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শব্দের শক্তি তাদের অনুপস্থিতিকেও ছাড়িয়ে যায় এবং সেসব গল্প বলা হোক বা না-হোক— প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য প্রভাব রাখতে সক্ষম|আজও হেমিংওয়ের একাধিক উপন্যাস, যেমন দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি এবং দ্য সান অলসো রাইজেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হচ্ছে| তাঁর প্রভাব সাহিত্যের বাইরে বিস্তৃত, কারণ তাঁর লেখার ধরন অসংখ্য লেখক অনুসরণ করেন এবং নিঃসন্দেহে আগামীতে প্রজন্মের নতুন লেখক ও পাঠককে অনুপ্রাণিত করবে|শেষ কথা: আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আত্মহনন পঁয়ষট্টি বছর আগে হলেও এখনো বিতর্কিত এবং আলোচিত| অনেকে মনে করেন যে, তাঁর মধ্যে ছিল মানসিক অসুস্থতা, শারীরিক কষ্টের অভিজ্ঞতা এবং একাকীত্ব ও অযোগ্যতার অনুভূতি| বিশ্বজুড়ে তাঁর খ্যাতি এবং সাহিত্যিক সফলতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেননি| তাই হয়তো আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন| অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন যে, তাঁর আত্মহননের কারণ ছিল রহস্যময় ও কাকতালীয় ‘হেমিংওয়ে অভিশাপ’| তবে যে কারণই হোক না কেন, তাঁর দুঃখজনক পরিণতি মানুষের কষ্টের জটিলতার বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়|এ কথা সত্যি যে, আত্মহত্যা কোনো ধরনের সমস্যার সমাধান নয়, বরং এক ধরনের প্রতিরোধযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সংকট| তাই জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, আত্মহত্যা কখনো বিকল্প হতে পারে না| এছাড়া  স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করা কারোর জন্যই সমস্যা সমাধানের পথ হতে পারে না, বরং পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিতদের একটা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে|

সব শেষে বলতে হয়, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বিশ্বজুড়ে সাহিত্যিক সমাজ এবং তাঁকে যারা ভালোবাসত, নিঃসন্দেহে তাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি|