জুন থেকে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহ জুলাইয়ের শুরুতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উত্তর গোলার্ধে জেঁকে বসেছে নজিরবিহীন ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উৎসব ম্লান করে দিয়েছে তীব্র দাবদাহ। ইউরোপের একাধিক দেশে জারি হয়েছে রেড অ্যালার্ট। রেকর্ডভাঙা এই তাপপ্রবাহ যেন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপটিকে দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববাসীকে ।শনিবার (৪ জুলাই), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০তম স্বাধীনতা দিবস। তবে তীব্র দাবদাহের কারণে দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ অনেকটাই ম্লান। পূর্ব উপকূলের প্রধান শহরগুলোতে তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৩৮ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতার কারণে ‘ফিলস-লাইক’ বা অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি। অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে ওয়াশিংটন ও ফিলাডেলফিয়ার বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী প্যারেড ও আউটডোর কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ একযোগে এসি চালানোয় ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের বিদ্যুৎ গ্রিডে চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে, কিছু এলাকায় লোডশেডিংয়েরও খবর পাওয়া গেছে।তীব্র তাপপ্রবাহ ইউরোপে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ফ্রান্সের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্যারিসসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে গত দুই সপ্তাহে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামেও বয়স্ক ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর খবর মিলেছে।ফ্রান্সের আবহাওয়া দপ্তর বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি বিভাগের কর্মী সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।শহরের ফোয়ারা ও শীতলীকরণ কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়েছে।তীব্র গরমে রাইন ও দানিউব নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই চরম আবহাওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে । প্রথমত, ‘হিট ডোম’ বায়ুমণ্ডলের উচ্চচাপ যখন গরম বাতাসকে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর আটকে রাখে, তখন তা গ্রিনহাউজের মতো কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এল নিনোর পরবর্তী প্রভাব ও বৈশ্বিক উষ্ণতা। মহাসাগরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়েছে, যা তাপ ধরে রেখেছে এবং রাতের বেলাতেও আবহাওয়াকে শীতল হতে দিচ্ছে না।বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, যা এক অভূতপূর্ব জলবায়ু পরিবর্তন পর্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে ।ইউরোপ ও আমেরিকার নির্মাণ খাত এবং কৃষিকাজের মতো আউটডোর সেক্টরগুলোতে কাজের সময় পরিবর্তন করে ভোরে বা রাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তীব্র খরা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল (বিশেষ করে গ্রিস ও ইতালি) এবং আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলের বনাঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।বিশ্বমিডিয়ায় প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এই ‘হিট ডোম’ আগামী কয়েকদিন আরও শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, উত্তরের অর্ধেক পৃথিবীকে আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও তীব্র তাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে। যা ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত মৃত্যু, খরা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।