মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগরে মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক প্রকল্পের কাজ চার বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর গাফিলতি ও অনিয়মে অচল হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকার এ প্রকল্প। ফলে এ দুই উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার সাধারণ পরিবার নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার সদর ও রাজনগর উপজেলায় মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক প্রকল্পের কাজ প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেবি) নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ কোটি টাকার এ কাজ পায় ২০২৩ সালে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক বার কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপরেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় এক বছর ধরে কাজ না করে লাপাত্তা হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামান এর সহযোগিতায় ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজ পায়। এর বিনিময়ে খালেদুজ্জামানকে টাকার ভাগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ না করেই কোটি টাকা বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি' শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং এর কার্যক্রম ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিলো। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের যৌথ বাস্তবায়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। এর অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি। ২০২১ সালে মৌলভীবাজারসহ সারাদেশের ৩০ টি জেলার ৯৮ টি উপজেলায় প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপদে পাইপলাইন ভিত্তিক পানি সরবরাহের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটি ভিত্তিক পাইপলাইন দিয়ে হতদরিদ্র ও প্রান্তিক ৩০-৪০ টি পরিবারে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়াও টয়লেট স্থাপন করা হবে। তবে মৌলভীবাজারে এ প্রকল্পের কাজ থমকে আছে এক বছর ধরে।

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, দুটি উপজেলার সকল ইউনিয়নে ৭৬ টি পানি সরবরাহ লাইন বসানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৩৮ টির মধ্যে ২২ টিতে আংশিক কাজ হয়েছে। তবে রাজনগর উপজেলার ৩৮ টি একেবারেই কাজ না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক বছর ধরে উধাও হয়ে গেছে। কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য নতুন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে।

সরেজমিনে রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক প্রকল্পের কাজের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়রাও এই কাজ সম্পর্কে অবগত নয়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনিঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহল এলাকায় দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অতি নিম্নমানের আংশিক কাজ করে উপকারভোগীদের মাঝে হস্তান্তর না করেই লাপাত্তা হয়ে যায়। উপকারভোগীরা তাদের নিজস্ব অর্থায়নে মটর, পাইপ ও বিদ্যুতের মিটার সংযোগ করে নিজেরাই লাইন চালাচ্ছেন।

কির্তার মহলের বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, ‘আমরা এক বছর আগে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করে পানির লাইন সচল করেছি। এখানে ৩০ পরিবার এ লাইন থেকে পানি সরবরাহ করে। এখানে মটর, পাইপ, মিটার, উপরে যাওয়ার জন্য সিঁড়িসহ কিছুই দেওয়া হয়নি। এখানে খাবার পানি নেই এজন্য কষ্ট করে আমরা এটা নিজস্ব টাকা দিয়ে ঠিক করেছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে পাইপ লাগিয়ে ছিলো তা কয়েকদিনের মধ্যেই ফেটে গেছে। খুব নিম্ন মানের কাজ হয়েছে।’

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ‘মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের উপর অভিযোগ রয়েছে তিনি কুমিল্লার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কমিশনের বিনিময়ে কাজ পেতে সহযোগিতা করেছেন। খালেদুজ্জামান এর আগে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত ছিলেন। ফলে এ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাহিন আলম, রমিজ মিয়া সহ কয়েকজন খালেদুজ্জামানের পূর্ব থেকেই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাছাড়া সবাই একই জেলার বাসিন্দা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক শাহিন আলম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরে কর্মরত আছেন। তিনি নিজের নামে লাইসেন্স না করে বিভিন্ন সময় অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ এনে করছেন। একই অধিদপ্তরে চাকরি করে কিভাবে শাহিন আলম ঠিকাদারি করছেন আবার এতো টাকার কাজ পেলেন তা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এ প্রকল্পের কাজ কতোটুকু হয়েছে বা কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে এবং কতো টাকা বিল তুলেছে এসব বিষয়ে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের কেউ কিছু জানেন না। প্রকল্পের বিষয়ে মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের অফিসে যাওয়ার পরেও দেখা না করে তিনি চলে যান। এছাড়াও অসংখ্যবার মেসেজ ও ফোন করেও কোন উত্তর মেলেনি। বিষয়টি জানার জন্য জেলা অফিস থেকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসে গিয়েও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, ‘মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। এ কাজ করছেন শাহিন আলম নামে একজন। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরে কর্মরত আছেন। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তিনি এ কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। ‘

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, ‘এ কাজটা আমার নয়। এ কাজের মালিক হচ্ছে শাহিন নামে একজন। সে জনস্বাস্থ্যে চাকরিও করে আবার ঠিকাদারিও করছে। একসাথে দুটো হয়না এজন্য মাঝখানে আমি কিছুদিন নজরদারি করেছি। তবে সে ঠিক মতো কাজ করেনা, এজন্য চলে এসেছি। আমি থাকা অবস্থায় ৯০ লাখ টাকার বিল তুলেছিলাম। এরপর টাকা তুলেছে কিনা আমার জানা নেই। অফিসের সিস্টেম অনুযায়ী কাজ পেতে হলে সবাইকে খুশি করতে হয়।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক শাহিন আলমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের প্রাক্কলনিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ কাজের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। কাজ একেবারে যে হয়নি তা নয়। আপনি চাইলে দেখতে পারেন। আমরা নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেবো এ কাজ সম্পন্ন করার জন্য।’

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, ‘আসলে এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের সাথে আলোচনা করা হবে।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প) প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘মৌলভীবাজারের দুটি উপজেলায় কাজের জন্য নতুন করে টেন্ডার দেওয়া হবে এবং ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে। যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে চলে গেছে তারা শুধু মৌলভীবাজার নয় আরও চার জায়গায় কাজ ফেলে লাপাত্তা হয়ে গেছে।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরে চাকরি করে কিভাবে শাহিন আলম এ কাজ পেলেন এর জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘সে তার নিজের নামের লাইসেন্স নিয়ে কাজ করেনি। অন্য লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ পেয়েছে।’

শাহিন আলম এ কাজ পাওয়ার পিছনে খালেদুজ্জামান সংশ্লিষ্টতা আছে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি বলতে পারবোনা, তবে কাজ প্রক্রিয়া অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে।’

মাহিদুল ইসলাম/কেজে/এএসএম