এ যুগের মানুষের কল্পনাশক্তি কি ক্ল্যাসিক সাহিত্যকেও হার মানাবে? শেক্‌সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথেরা কি ভেসে যাবেন কালের স্রোতে? প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ওলটালে এমন সব খবরের দেখা পাওয়া যায়, যা অবিশ্বাস্য। বরিশালের মুলাদীতে এক স্ত্রী তাঁর স্বামীকে নিয়ে যা করেছেন, তার ব্যাখ্যা কি পাওয়া যাবে? হ্যাঁ, তিনি স্বামীকে হত্যা করেছেন গত শুক্রবার। কুপিয়েছেন, হাতুড়িপেটা করেছেন একদা বিয়ে করা স্বামীকে। এরপর নির্বিকারভাবে অভিনয় করে গেছেন। পাড়ার লোকজনকে অবলীলায় বলেছেন, একদল অজ্ঞাতপরিচয় লোক তাঁর স্বামীর হাত ও চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে তুলে ট্রলারে করে নিয়ে গেছে। স্বামী অপহরণের গল্পটা তিনি শুরুতে মোটামুটি ‘গিলিয়েছিলেন’ গ্রামবাসীকে। বাদ সেধেছিল তাঁর পরম্পরাহীন কথাবার্তা।

নিখোঁজ হারুন হাওলাদারের সন্ধান করতে শুরু করেছিল গ্রামবাসী। হারুন হালদারের ছেলে জাফর হাওলাদারকে খবর দিলে তিনি ঢাকা থেকে চলে আসেন মুলাদীতে, থানায় গিয়ে অপহরণ মামলা করেন। বাবার হত্যাকারী মা—এ রকম কথা দুঃস্বপ্নেও হয়তো ভাবেননি জাফর হাওলাদার। ভয় থেকেই হয়তোবা হারুন হাওলাদারের স্ত্রী সেলিনা বেগম নিজ বাড়ির রান্নাঘরের পাশে মাটি খুঁড়ে স্বামীর লাশ লুকিয়ে রেখেছিলেন। গভীর রাতে তিনি নিজ ঘরের মেঝে কাদামাটি দিয়ে লেপে দেন। পরদিন পাড়ার লোকজন মাটি লেপার ঘটনা দেখে অবাক হন। যাঁর স্বামী অপহৃত, তিনি দিব্যি ঘরের মেঝে লেপছেন, এটা কার চোখে অবিশ্বাস্য ঠেকবে না? তারপর যা হওয়ার তা-ই হয়। রান্নাঘরের পাশে নতুন মাটি এবং সেখানে একটি আঙুল বেরিয়ে থাকতে দেখে পুলিশ ডাকা হয়। পুলিশ এসে হারুন হাওলাদারের মরদেহ উদ্ধার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেলিনা বেগম নিজেই স্বামীকে হত্যা করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তাঁর পরকীয়ার জেরেই এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। হারুন হাওলাদারের ছেলে যে মামলাটি করেছিলেন, সেটাই এখন হত্যা মামলায় পরিণত হবে। জাফর হাওলাদারের আর কী থাকল—বাবা ও মা, দুজনকেই এক অর্থে হারালেন তিনি।

পরকীয়ার জেরে সম্পর্ক ভাঙছে, দুর্বুদ্ধি এসে শুভবুদ্ধিকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

অপরাধ কোনো লিঙ্গ বা বয়স ভেবে হচ্ছে না। যেকোনো বয়সে যেকোনো লিঙ্গের মানুষ খুনি হয়ে যাচ্ছে। সমাজের যে বন্ধন একসময় গোটা গ্রামকে, মহল্লাকে অভয় দিত, পাড়ার সমস্যা পাড়ার মানুষেরা মিলেই সমাধান করে ফেলত, সে অবস্থা আর নেই। মানুষ খুব দ্রুত একে অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে যন্ত্রনির্ভর জীবন, পরিবারে সুশিক্ষার অভাব, শিক্ষালয়ে মানবতাহীন যান্ত্রিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ অনেকাংশে দায়ী। সমাজজীবন যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আরও অনেক রকম দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। এখন প্রয়োজন, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, তার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। একজন সন্তানকে যেন তাঁর আপনজনের হত্যাকারী হিসেবে আরেক আপনজনকে দেখতে না হয়, সেই সমাজের দেখা মিলবে কি?